বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা দৃশ্যমান—সংবিধানকে ঘিরে এক ধরনের “দোষণ” বা অবিরাম দোষারোপের সংস্কৃতি। এই মানসিকতা কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ নয়; বরং এটি এক গভীরতর রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, নেতৃত্বের সংকীর্ণতা এবং ক্ষমতার লোভ আড়াল করতে সংবিধানকে সহজ লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।
এই প্রবণতাকে আমি নাম দিয়েছি “সংবিধান দোষণ”-এর রাজনীতি”। এর একটা সিক্রেট উদ্দেশ্য আছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই এই ভূখণ্ডে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নেতাদের ক্ষমতালিপ্সা একটি কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। যদিও ১৯৫৪ এ একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত ছিল, তথাপি তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ নয় বছরের সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। কিন্তু এর পরপরই শুরু হয় সংবিধানকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি। যেন সংবিধানই সমস্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতার মূল কারণ।
এরপর দীর্ঘ ১২ বছর সামরিক শাসন চলেছে, যেখানে সংবিধানের কোনো বাস্তব উপস্থিতিই ছিল না। আইয়ুব খানের প্রণীত সংবিধানও প্রকৃতপক্ষে ছিল তার শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি হাতিয়ার, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা নয়।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আবারও একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রে ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সংবিধানের প্রতিশ্রুতি। স্বাধীনতার পর সেই সংবিধান প্রণীত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সংবিধানও শীঘ্রই দোষারোপের শিকার হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে বাকশাল প্রবর্তন ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ওপর প্রথম বড় আঘাত। এরপর আবার সামরিক শাসন, সংবিধানের স্থগিতাবস্থা, এবং জনগণের অধিকার হরণের এক ধারাবাহিকতা শুরু হয়। মাঝখানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানকে বাকশাল এর অভিশাপ থেকে মুক্ত করেন।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সংবিধানের পুনরুজ্জীবনের সংগ্রাম হিসেবে আবির্ভূত হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং সংবিধান আবার কার্যকর হয়। কিন্তু এর পর থেকেই সংবিধান দোষণের রাজনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
এরপরও সংবিধান চলমান ছিল, যদিও দুর্বলভাবে; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে ক্রমাগত সংবিধানকে দায়ী করতে থাকে।
২০১১ সালে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনসমূহ এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দেয়, যা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদ এবং পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদের দিকে রাষ্ট্রকে ঠেলে দেয়। এই সময়কাল শেষ হয় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এবার সংবিধান দোষণের যে কণ্ঠ একসময় প্রান্তিক ছিল, তা মূলধারার শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসে।
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, সংবিধানকে দোষারোপ করার এই প্রবণতা মূলত আত্মঘাতী। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা এবং নেতৃত্বের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি। যারা মনে করে একটি নিখুঁত সংবিধানই সব সমস্যার সমাধান, তারা আসলে মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। কারণ বাস্তবতা হলো—কোনো সংবিধানই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না, যদি পরিচালনাকারীরা সৎ, দায়িত্বশীল এবং আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই আত্মতুষ্টির মানসিকতা—যেখানে ব্যক্তিগত সততা, নৈতিকতা এবং আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি গৌণ হয়ে যায়, আর সংবিধানকে সবকিছুর মাপকাঠি হিসেবে দাঁড় করানো হয়—তা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন কেবল একটি ভালো সংবিধান নয়, বরং তার যথাযথ প্রয়োগ এবং তার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা। সংবিধানকে দোষারোপ করে নয়, বরং তা মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলেই একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।
