রাত নামলেই যমুনার বুকে আঁধার ঘনায়। চরের কোনো বাড়িতে যদি সে রাতে কারও প্রসববেদনা ওঠে, কিংবা কারও বুকের পাঁজরে হাত দিয়ে ওঠে হাঁপানি- তাহলে আর উপায় থাকে না। নদী পার হওয়ার নৌকা নেই, নেই কোনো ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গেলে বাঁচানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না।
বেড়া উপজেলার যমুনাপাড়ের ২৫ চরে বসবাস করেন প্রায় এক লাখ মানুষ। হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুন ভারেঙ্গা ও পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের এই চরগুলোর নাম- চরনাগদহ, চরপেঁচাকোলা, চরসাফুল্লা, পূর্বশ্রীকন্ঠদিয়া, চরকল্যানপুর, পেংগুয়ারচর, দেওলাই, বোড়ামারা, সিংহাসন, ঢালারচর- যেন বঞ্চনার ভৌগোলিক স্মারক।
এত মানুষের জন্য মোট পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল। তার মধ্যে দুটো ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাকি তিনটিতে ঠান্ডা-কাশির ওষুধ ছাড়া তেমন কিছু নেই। কোনো ক্লিনিকেই নেই স্থায়ী চিকিৎসক। নেই প্রসবের ব্যবস্থা। নেই জরুরি বিভাগ।
হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের এক সদস্য জানান, “চরনাগদাহ গ্রামে কমিউনিটি হাসপাতাল দুই বছর আগে নদীতে চলে গেছে। আমরা অনেক দপ্তরে জানিয়েও কোনো কাজ পাইনি। নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে বাজারের পাশে টিনের ঘর তুলেছি, কিন্তু ওষুধ নেই, লোক নেই।”
চরের মানুষদের একমাত্র যোগাযোগ নৌকা। অসুস্থ হলে ভয়ে ভয়ে নদী পেরোতে হয়। বর্ষায় তো কথাই নেই। রাতের বেলায় রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া অসম্ভব। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা কাশিনাথপুরের প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে গেলে নদী পেরোতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া আর নৌকা সংকটে প্রায়ই সময়মতো পৌঁছানো যায় না।
স্থানীয় এক মাঝির ভাষ্য, “চার দশক ধরে এখানে আছি। সরকার দুই যুগ আগে ক্লিনিক দিয়েছে, তাতে ওষুধ নেই, ঠিকমতো খোলে না। গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। আমরা যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছি।”

২০১৩ সালে সরকার চরাঞ্চলের জন্য একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (ওয়ান বেড ক্লিনিক বোট) বরাদ্দ দিয়েছিল। সেই নৌযানটি কখনো নদীতেই নামানো হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি। “নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কোনদিন নদীতেই যায়নি”- এ কথা আজও চরের মানুষের মুখে মুখে।
সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব- কিছুই নেই। বিবি কুলসুম বলেন, “গভীর রাতে প্রসববেদনা ওঠে। অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল, কিন্তু নদী পার হওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ধাত্রী দিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে হয়।”
অপুষ্টি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া- এসব সাধারণ রোগই প্রাণ কেড়ে নেয় শিশুদের। বয়স্কদের অবস্থা আরও খারাপ।
নতুন ভারেঙ্গার জনপ্রতিনিধিরা বলেন, “চরসাফুল্লাপুরে একটি কমিউনিটি সেন্টার ছিল, তিন বছর আগে নদীভাঙনে সেটিও চলে গেছে। ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছিলাম, এখনও কোনো বরাদ্দ আসেনি। চরের মানুষের জন্য দ্রুত একটি কমিউনিটি সেন্টার, স্থায়ী চিকিৎসক, ওষুধ আর জরুরি রোগী পরিবহনে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চাই।”
পুরান ভারেঙ্গা ইউপি’র এক সদস্য জানান, তার ইউনিয়নের পাঁচটি ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। একমাত্র ভরসা চরকল্যানপুর কমিউনিটি হাসপাতাল। “সেখানেও ঠান্ডা-কাশির ওষুধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।”
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা নীলা স্বীকার করেন, “দেশের নাগরিক হিসেবে চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তবে বেড়া উপজেলার চরের মানুষদের চিকিৎসাসেবা পাওয়াটা প্রকৃতপক্ষেই কষ্টকর। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। আজও চরের মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে স্থানীয় ফার্মেসি, ঝাড়ফুঁক আর অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর।
