শিক্ষক নামক ‘দাস’গুলোকে মনে রাখবে নরসিংদীর সেই প্রতিষ্ঠানের বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। মনে রাখবে তাদের, যারা শিক্ষকতার মহৎ পরিচয়টিকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। মনে রাখবে তাদেরও, যারা শত শত শিক্ষার্থীকে পেছনে রেখে মাত্র একটি অংশের ফলাফলকে সামনে এনে উল্লাস করেন, সাফল্যের গল্প বলেন, প্রচার চালান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য সত্য হলে, নরসিংদীর ওই প্রতিষ্ঠানে এসএসসি পর্যায়ে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র ৩৮২ জনকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি সত্য হলে, প্রায় ৫১৮ জন শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানের দরজায় প্রায় ৯০০টি পরিবার তাদের সন্তানকে নিয়ে এসেছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল সন্তানটি পড়বে, শিখবে, বেড়ে উঠবে এবং একদিন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিজের ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী যদি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার মাঠেই নামতে না পারে, তাহলে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় কীভাবে? অন্যদিকে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জনের ফলাফল সামনে রেখে যদি এখন চলছে সাফল্যের প্রচার, উচ্ছ্বাস, অভিনন্দন ও আত্মপ্রশংসা—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: এই সাফল্যের হিসাবের বাইরে থাকা ৫১৮ জন কোথায়? কী চমৎকার ব্যবসায়িক মডেল, যদি অভিযোগটি সত্য হয়! প্রথমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করো। এরপর যারা প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করতে পারবে, তাদের রেখে দাও; যারা ফলাফলের গড় কমিয়ে দিতে পারে, তাদের বাদ দাও। তারপর নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফলাফল সামনে রেখে শতভাগ সাফল্যের প্রচার চালাও। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি শিক্ষা, নাকি ফলাফল ব্যবস্থাপনার এক নতুন ব্যবসায়িক মডেল? অবশ্যই, অভিযোগ সত্য কি না, কেন এত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের নীতিই বা কী ছিল এসবের নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তবে বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে আলোচনা নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি নিয়েই বড় প্রশ্ন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই প্রশ্নটি করার কথা ছিল শিক্ষকদের। প্রশ্ন করার কথা ছিল শিক্ষা প্রশাসনের। প্রশ্ন করার কথা ছিল অভিভাবকদের। অথচ সবাই যেন কোনো এক অদৃশ্য মোহে চুপ। কারণ আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিক্ষার্থী নয়—ফলাফলই পণ্য। শিক্ষক নয়—প্রতিষ্ঠানই ব্র্যান্ড। আর শিক্ষা নয়—এ+ হয়ে উঠেছে বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন।
একজন শিক্ষক হওয়ার কথা সেই মানুষটি, যিনি দুর্বল শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াবেন। যে ছাত্রটি পিছিয়ে পড়েছে, তাকে টেনে তুলবেন। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করতে পারছে না, তাকে আরও সময় দেবেন, শেখাবেন, উৎসাহ দেবেন। তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু শিক্ষক যদি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল তৈরির কর্মীতে পরিণত হন, তাহলে তিনি আর শিক্ষকের ভূমিকায় থাকেন কোথায়? একজন শিক্ষক ১০ জন ভালো ছাত্রকে নিয়ে শতভাগ সাফল্যের গল্প বলতে পারলেন, এটাই কি তাঁর সাফল্য? নাকি সেই শিক্ষক বেশি সফল, যিনি ১০ জন দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮ জনকে ধরে রাখতে, শেখাতে এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করাতে সক্ষম হলেন? এই প্রশ্নটি আমাদের করতেই হবে। কারণ ভালো শিক্ষার্থীকে ভালো ফল করানো কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে ধরে রাখা, তাকে শেখানো, তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া—এটাই প্রকৃত শিক্ষকতা।
দুঃখজনকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যেন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। যে শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানকে ভালো ফল এনে দেবে, সে গুরুত্বপূর্ণ। যে শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের গড় কমিয়ে দিতে পারে, সে হয়ে ওঠে ‘বোঝা’। এখানেই শিক্ষকতার পরাজয়। এখানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক চরিত্রের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার দায় শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়; অভিভাবকরাও এর অংশ হয়ে পড়েছেন। সন্তান ভালো মানুষ হচ্ছে কি না এই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, ‘এ+ পেয়েছে তো?’ কোন স্কুলে কতজন এ+ পেল, কতজন গোল্ডেন পেল, কোন প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাস করল, এসব নিয়ে আমাদের উন্মাদনা। অথচ সেই শতভাগের বাইরে কতজন শিক্ষার্থী ঝরে গেল, কতজন পরীক্ষায় বসতে পারল না, কতজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল সেই হিসাব কেউ রাখতে চায় না। আমরা কি কখনো জিজ্ঞেস করেছি— ৯০০ জন ভর্তি হয়েছিল, ৩৮২ জন পরীক্ষা দিল—বাকি ৫১৮ জন কোথায়? কেন তারা পরীক্ষা দিতে পারল না? তাদের জন্য প্রতিষ্ঠান কী করেছে? তাদের অভিভাবকদের কী বলা হয়েছিল? তাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে? আর সবচেয়ে বড় কথা—যদি সত্যিই তাদের কাউকে প্রতিষ্ঠানের ফলাফল সুন্দর রাখার স্বার্থে পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায় কে নেবে? একটি প্রতিষ্ঠান যদি কয়েকশ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার বাইরে রেখে বাকি শিক্ষার্থীদের ফলাফল দিয়ে শতভাগ সাফল্যের দাবি করে, তাহলে সেই সাফল্যকে শুধু সংখ্যার চোখে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোকে। কারণ শিক্ষার সাফল্য শুধু কতজন ভালো ফল করল, তার হিসাব নয়। শিক্ষার সাফল্য হলো—কতজনকে ধরে রাখা হলো, কতজনকে শেখানো হলো, কতজন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে সামনে নিয়ে আসা হলো এবং কতজনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হলো। একজন শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে নিজের ফলাফল সুন্দর করা কোনো সাফল্য নয়। বরং একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে হারিয়ে নিজের ‘শতভাগ’ অর্জন করা হলে, সেটি সাফল্যের চেয়ে বেশি ব্যর্থতার গল্প। আর এখানেই ‘শিক্ষক’ নামক মানুষটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কটি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শিক্ষক কি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মাত্র? নাকি তিনি সমাজের বিবেক? শিক্ষক কি শুধু প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ পালন করবেন, নাকি অন্যায় মনে হলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস রাখবেন? শিক্ষক কি শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে মঞ্চে উঠবেন, ছবি তুলবেন, ফুলের মালা পরাবেন, নাকি যে শিক্ষার্থীটি ব্যর্থ হয়েছে, তার চোখের জলও দেখবেন? যদি কোনো শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শিক্ষার্থীর স্বার্থকে বিসর্জন দেন, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে একজন পেশাজীবী কর্মচারীতে পরিণত হন। কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো শুধু প্রতিষ্ঠানের চাকরি করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব বহন করেন। তাই আজ ৩৮২ জনের এ+–এর উল্লাসের পাশাপাশি সেই ৫১৮ জনের নীরবতাকেও মনে রাখা দরকার। মনে রাখা দরকার তাদেরও বাবা-মা আছে। তাদেরও স্বপ্ন ছিল। তারাও একদিন ভেবেছিল পরীক্ষা দেবে, ভালো করবে, সামনে এগিয়ে যাবে। তাদের কেউ যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘সাফল্যের হিসাব’ সুন্দর রাখার স্বার্থে বাদ পড়ে থাকে, তবে সেই সাফল্যের উৎসবের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি গভীর কান্না লুকিয়ে আছে। শুধু এ+ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যারা নেচে-গেয়ে সাফল্যের স্তুতি গায়, তাদেরও মনে রেখো। মনে রেখো সেই শিক্ষকদের, যারা প্রশ্ন করার বদলে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পোস্টার হয়ে যান। মনে রেখো সেই অভিভাবকদের, যারা সন্তানের মানুষ হয়ে ওঠার চেয়ে এ+–এর পেছনে ছুটতে ছুটতে শিক্ষা নামের মূল বিষয়টিই ভুলে যান।
আর সবচেয়ে বেশি মনে রেখো সেই শিক্ষার্থীদের যাদের বাদ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যদি কোনো ‘শতভাগ সাফল্যের’ গল্প। কারণ শিক্ষা কোনো বিজ্ঞাপন নয়। শিক্ষার্থী কোনো পণ্য নয়। এ+ কোনো প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতার সনদ নয়। আর একজন শিক্ষক, তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পোস্টার নন। তিনি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কাছে দায়বদ্ধ মানুষ। সেই দায়বদ্ধতার নামই শিক্ষকতা।
