পড়ন্ত বিকেলে জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গুরুদেব জনমানুষের সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক উপলব্ধি করেছিলেন; ‘পরিচয়’ (১৯৩৬) কবিতায় নিজের পরিচয় উপস্থাপন করেছিলেন এইভাবে— ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’। প্রায় বিদ্যায়তনিক জীবন থেকেই বলা যায়, গুরুদেবের ঐ আত্মীক উপলব্ধি বিভিন্ন সভাসমাবেশ কিংবা বক্তব্য—বিবৃতিতে তন্ময় হয়ে শুনে আসছি। কিন্তু বেশ কয়েকদিন জীবনানন্দের ‘বোধ’ কবিতার মতো ঐ উক্তিটি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আসলে রবীন্দ্রনাথ ‘তোমাদের’ বলতে কাদেরকে বুঝিয়েছিলেন?
২
গুরুদেবের ভক্তরা গোস্বা করতে পারে জেনেও বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই— এই ‘তোমাদের’ শব্দটির মধ্যে কি মুসলিম জনগোষ্ঠীও কি ছিল? তার জীবনকালে দুইবঙ্গ মিলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তো একেবারে কম ছিল না। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের কথা বলা যায়। শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের মতো তিনতিনটি জমিদারি দেখভালের সময় মুসলিম প্রজারা তার দরবারে আসতো, কুশল বিনিময় হতো, খাজনাদি প্রদান করতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গদ্যসাহিত্যে বিশেষ করে প্রবন্ধনিবন্ধে নিজেই এইসব বিষয় উল্লেখ করে গেছেন। এমনকি মুসলিম প্রজার সংখ্যাই বেশি ছিল অন্তত অমিতাভ চৌধুরী তো তাই মনে করেন। শিলাইদহ জমিদারির একটি পরগণার নাম ছিল বিরাহিমপুর এবং একটি গ্রামের নাম ছিল খোরশেদপুর গ্রাম। সুতরাং মুসলিম জনসমাজ ও জীবনাচরণ প্রসঙ্গে তিনি জানতেন না তা কিন্তু নয়। পূর্ববাংলার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, খালবিল, নদীনালা, তরুলতা, বৃক্ষরাজি, আকাশ—বাতাস, আবহাওয়া ও জলবায়ু ইত্যাকার কত কিছু তার সাহিত্যে ঠাঁই পেল। সেই তুলনায় মুসলিম জনগোষ্ঠী অবস্থান কি খুব একটা আছে?
৩
ব্যক্তিগত জীবনে রবীন্দ্রনাথ জমিদারতনয় ছিলেন। এমনকি তার পিতা ও পিতামহের মতো পূর্বপুরুষেরা জমিদার ছিলেন। তিনি নিজেও জমিদারির পক্ষেই লিখেছিলেন অন্তত ‘রায়তের কথা’ নিবন্ধ তো তাই বলে। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও মনের ভুলেও সাম্যবাদের কথা উচ্চারণ করেননি। তার কারণ কি এই যে, তিনি নিজেই ছিলেন জমিদার শ্রেণির অন্তর্গত? সম্ভবত সেই কারণেই সাহিত্যজীবনের প্রথমদিকের সাহিত্যে উচুতলার মানুষের কথাই বেশি করে এসেছে; বিশেষ করে তার উপন্যাসের নায়কেরা কেউ ডাক্তার, কেউ অধ্যাপক, কেউ জমিদার, কেউবা বিলাতফেরত বড় ঘরের আদুরে সন্তান। মূলত ‘উচ্চ মঞ্চে’ বসার কারণে (জমিদারিত্ব) সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগের স্বল্পতার কথা তার স্বীকারোক্তিতেই পাওয়া যায়। তবে তার জীবনতরীর ভাটারকালে হলেও প্রান্তজনকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন।
৪
গুরুদেব কবিকে জীবনচরিতে খুঁজতে নিষেধ করেছিলেন। তাই বলে কি কবির জীবনচরিতকে সরিয়ে রাখা যায়? বরং গুরুদেবকে নিয়ে দুই বাংলায় বিগভলিউমে জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়েছে। রবীন্দ্রজীবনী পড়তে গিয়ে প্রশ্ন জাগে— জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই ভাইয়ের এতো সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক শিথিলতার কারণ কি? নোবেল প্রাপ্তিতে কেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আদরের ছোটভাই রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানালেন না? দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর কেন তিনি ঠাকুরবাড়ি ছেড়ে রাঁচিতে গিয়ে ঘর বাঁধলেন? সতেরোটি বছর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কেন একাকি এমন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করলেন? অন্যদিকে বিশ্বপরিমণ্ডল পরিভ্রমণ করে বেড়ালেও রবীন্দ্রনাথ কেন তার প্রিয় জ্যোতিদাদার সাথে দেখা করতে গেলেন না? শান্তিনিকেতন থেকে রাঁচির শান্তিধামের দূরত্ব কি খুব বেশি ছিল? মৃত্যুর আগে জ্যোরিন্দ্রনাথের ‘রবিরবি’ বলে উচ্চারণ করলেও সেই উচ্চারণ কেন রবীন্দ্রনাথের কানে পৌঁছতে পারল না? তাহলে দুই ভাইয়ের মধ্যে মানঅভিমান ও দূরত্বের কারণ কি কাদম্বরী দেবী নাকি জমিদারির হিস্যা বা আরো অন্য কিছু?
৫
যা হোক, রবীন্দ্রনাথও মানুষ ছিলেন। হয়তোবা তারও সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই সব সীমাবদ্ধতা স্মরণে রেখেও বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের পরম পাওয়া। তার বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম ও সাহিত্যচিন্তার মধ্যে আমরা যদি ঐ একটি উপলব্ধি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’ আমাদের মন ও মনননে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তবু আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমাদের রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক সংঘাত, সাংস্কৃতিক সংঘাত অনেকাংশে কমে যায়। রবীন্দ্রনাথের ঐ মানবিক চিন্তা দিয়ে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কও সুসংহত হতে পারে। এমনকি ইরান—আমেরকিার ঐ নিদারুণ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধটিও থামিয়ে দেয়া যেতে পারে।
৬
কিন্তু প্রশ্ন হলো মান্যতার জায়গায়। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কতটুকু মানতে পারছি। রবীন্দ্র—ভক্তরাইবা রবীন্দ্রনাথকে কতটুকু ধারণ করতে পেরেছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি ঐ পশ্চিমবাংলার বাসিন্দারাও কি আদৌ মনেপ্রাণে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করতে পেরেছে বিশেষ করে যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পারলে সেটা কতটুকু। যদি তাই পারতো, তাহলে বিজেপির বিজয়ে সংখ্যালঘুর উপর কি এমন নিদারুণ নিপীড়ন নেমে আসতো? রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে বলতাম— তোমার ‘গোরা’কে তোমার দেশের মানুষ ধারণ করতে পারেনি; ধারণ করেছে বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’। এটি তোমার নয় — তোমার পাঠকের পরাজয়।
