আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে প্রাকৃত ভাষা থেকে আজকের এই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। তখন ওপরতলার কেউ এই ভাষায় কথা বলতো না। এমনকি এতো বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বলা যায় এই ভাষাটি আজো উচ্চবর্ণ ও বিত্তের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে পারেনি। এখনো এই ভাষা অনেকটাই অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। এই ভাষায় কোনো পুণ্যশ্লোক রচিত হয়নি, রচিত হয়নি কোন ধর্মগ্রন্থ কিংবা উপগ্রন্থ। তাই উচ্চবর্ণ ও বিত্তের মানুষের কাছে এই ভাষা তেমন আদর পায়নি। কি হিন্দু কি মুসলমান, সমাজের ওপরতলার মানুষ বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলতো। এদের কাছে সংস্কৃত ও উর্দু আভিজাত্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ছিল।
শিক্ষাদীক্ষা, চাকরিবাকরি, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত পরিবারবর্গ কারো কাছেই বাংলা ভাষা আদরীয় ছিল না। মূলত মুসলিম পরিবার হলে উর্দু আর সনাতন পরিবার হলে সংস্কৃতের দিকে ধাবিত হতো। ‘বাংলার বাঘ’ বলে পরিচিত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক লক্ষ্ম অধিবেশনে উর্দুতে জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার কারণে সেদিন তার কপালে ‘বাংলার বাঘ’ উপাধি জুটেছিল।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, লিয়াকত আলী খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কিংবা খাজা নাজিমুদ্দিনসহ কোন অভিজাত পরিবারের অন্দরে—বাহিরে কোথাও বাংলা ভাষার চিন্তাচর্চা ছিল না। এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও বাংলা ভাষার কারণে বিদ্যাসাগর উপাধি পাননি। সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্যই তাকে এই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি প্রদান করা হয়েছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত (১৮৫৭) হওয়ার পরও বাংলাকে স্বতন্ত্র ভাষাবিভাগের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। দীনেশচন্দ্র সেনের পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের সংগ্রহশালা দেখে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাপর বিদ্যা ও বিষয়ের অধ্যাপকেরা নাক শিটকাতেন। তারা বাংলা ভাষায় রচিত এইসব পুঁথিসাহিত্যকে খুব একটা প্রয়োজনীয় বিবেচনা করতেন না। এজন্য ‘আশুতোষ স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে দীনেশকে নিদারুণ দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালেও (১৯২১) বাংলাকে স্বতন্ত্র ভাষাবিভাগের মর্যাদা না দিয়ে সংস্কৃতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কমবেশি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনি সংস্কৃত ভাষা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন; লিখেছিলেন ‘অষ্টাধ্যয়ী ব্যাকরণ’। কিন্তু বাংলা ভাষাভাষীর কাছে বাংলা ভাষা গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে বহু সময় লেগে যায়। বাংলা ও সংস্কৃত পাশাপাশি একই অঞ্চলের সমসাময়িক ভাষা হলেও ভাষা দুটি সমভাবে সমকালে সমমর্যাদা পায়নি। বাংলা ভাষা ছিল বরাবরই উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার। চর্যাপদের মতো কিছু কবিতা বাঙালির হাতে রচিত হলেও বাংলা ভাষাতত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করেছিল মূলত অবাঙালি ইউরোপিয়ানদের হাত ধরে।
বাংলা ভাষাতত্ত্বের সূচনা ঘটেছিল মূলত মানোএল দ্যাঁ আসসুম্পসাঁউ নামের একজন পতুর্গীজ ধর্মযাযকের হাত ধরে। ঢাকার ভাওয়ালে বসে তিনি রচনা করেছিলেন ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা ইন পোর্তুগীজ’ নামের একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটি ১৭৩৪ সালে লিসবন থেকে বেরিয়েছিল। এই গ্রন্থে সর্বপ্রথমে বাংলা বর্ণমালাকে রোমান হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। আঠার শতকের চল্লিশের দশকে বইটি প্রকাশ হলেও বইটির প্রতি বাঙালি সমাজের তেমন আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। এর প্রায় তিনদশক পরে কলকাতার হুগলি থেকে ন্যাথানিয়েল ব্যাসি হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অব বেংগল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৭৮৮) প্রকাশ হয়। এই গ্রন্থে বাংলা বর্ণমালা সর্বপ্রথম ধাতুতে ঢালাই করা হয়।
এরপর আস্তেধীরে হলেও বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির আগ্রহ বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে ভালোবাসা। বাঙালিও বাংলা ভাষাচর্চায় এগিয়ে আসতে থাকে। রাজা রামমোহনের হাতে রচিত হয় ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ (১৮৩৩)। এরপর বাংলা ভাষাচর্চায় অনেকেই এগিয়ে আসেন যেমন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিধুশেখর ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী, মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ দানীউল হকসহ আরো অনেকে। তবে এসব ভাষাবিজ্ঞানীদের ভাষাচর্চার স্থল ছিল মূলত ইউরোপ—আমেরিকা। বাংলা ভাষা বিষয়ক তাদের গবেষণালব্ধ নানা প্রবন্ধনিবন্ধ ইংরেজি ভাষার আশ্রয়ে লিখিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের মতে, এসব গবেষণা আমাদের থেকে ‘দূরে থেকে গেছে।’
ড. সুনীতিকুমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদ্যায়তনিক পড়ালেখা শেষে ইংরেজি বিভাগেই অধ্যাপনা শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ বারো বছরের সাধনায় লিখেছিলেন The origin and development of Bengali language (১৯২৬)। যদি তারা মাতৃভাষায় চর্চাটা করতেন তাহলে বাংলা ভাষায় একটি শক্তিশালী ভাষাতাত্ত্বিক ধারা গড়ে উঠতে পারতো। যা হোক, গবেষণা করে তো ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না কিংবা ভাষাকে এগিয়ে রাখাও যায় না। যদি তাই হতো, তাহলে সংস্কৃত ভাষার নিদারুণ মৃত্যু ঘটতো না। তাছাড়া ভাষারও নিজস্ব শক্তি থাকতে হয়।
ভাষার জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রসঙ্গে ‘ভাষা’ শিরোনামের একটি কবিতায় কবি মজিদ মাহমুদকে লিখতে দেখি-
‘মানবশিশুকে আশ্রয় করে তারা ওঠেছিল বেড়ে
ধ্বনির প্রতীকগুলো মস্তিস্কে বেঁধেছিল বাসা
এভাবেই প্রকাশিত দৃশ্য ও অদৃশ্যের জগত।’
এটি শাশ্বত সত্য যে, মানবশিশুকে আশ্রয় করেই ভাষা বেড়ে ওঠে; মানবশিশুকে আশ্রয় করেই ভাষা তার গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। যেখানে মানুষ নেই সেখানে ভাষাও নেই। যেখানে মানুষ আছে সেখানে ভাষাও আছে। মানুষ ছাড়া ভাষা বাঁচতে পারে না। আবার ভাষা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। তাই মানুষ ও ভাষার সম্পর্ক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য। মহামতি আহমদ ছফার ভাষায়- সমুদ্রের জল থেকে যেমন নীলকে আলাদা করা যায় না তেমনই মানুষের কাছ থেকে তার ভাষাকে আলাদা করা যায় না। কারো ওপর জোর করে অপর ভাষা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তাই বায়ান্নতে বাঙালির ওপর উদুর্কে চাপিয়ে দেওয়া কিংবা বাংলাকে কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র কোনোটাই সফল হয়নি।
এই যে সহস্র বর্ষের বাংলা ভাষার চড়াই—উৎরাই, এই যে জন্ম থেকে অদ্যাবধি এই দুখিনী বর্ণমালা বড়লোকের ঘরে ঠাঁই না পেলেও তার শ্রীবৃদ্ধি করেই চলছে তার পেছনে রয়েছে বেশ কতগুলো কারণ। এই ভাষা অপরকে দারুণভাবে আপন করে নিতে পারে। আর এই দেশের অগণিত—অসংখ্য প্রান্তবাসী হাজার বছর ধরে এই ভাষাতেই তাদের সুখদুখ, হাসিকান্না, ব্যথা ও বেদনার ভাব ও ভার প্রকাশ করে আসছে। তাছাড়া এই ভাষায় রয়েছে প্রচুর প্রাণশক্তি, রয়েছে প্রাণোচ্ছল গতিময়তা। সেই গতিময়তায় আরো প্রাণদান করেছিল এই দেশের সৃজনশীল কবিশিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার, গল্পকার ও গদ্যকারেরা।
কাহ্নপা—লুইপা থেকে শুরু করে বিদ্যাপতি—চণ্ডীদাস, মাইকেল থেকে শুরু করে রবীন্দ্র—নজরুলের যুগ পেরিয়ে তিরিশের পঞ্চপাণ্ডব হয়ে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মজিদ মাহমুদ ইত্যাকার কবি সাহিত্যিক, লেখক ও লিখিয়েদের হাত ধরে বাংলা ভাষা বেশ দারুণ গতিময়তা লাভ করে। পৃথিবীর বহু দেশে বহু ভাষা থাকলেও আমাদের বাংলাদেশে কিন্তু একটিই ভাষা। তাই বাংলাদেশই বাংলা ভাষার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ কি তা পারবে?
