সম্প্রতি জুলাই আন্দোলনে ব্যবহৃত কয়েকট স্লোগানের ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শব্দগুলোর মাধ্যমে ভাষার বিশুদ্ধতা ও রাজনৈতিক কালচার বিষয়ক আলাপ এই কারণে তুঙ্গে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত জানাচ্ছেন নেটিজেনরা। ফেসবুক পোস্টে দেশের তিন বিশিষ্ট কবি, শিক্ষক ও গবেষকের মতামত এখানে তুলে ধরছি- স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ভাষার
News Just In
View Moreবাংলাদেশ
আরো দেখুনপাবনার সদর উপজেলার রামানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে…
আন্তর্জাতিক
আরো দেখুনআমি জানি না, হে মাতৃভূমির সন্তান—শোনো আমার মায়ের নাতিরা,এখন হাসির সময় নয়,কান্নারও নয়—এখন প্রশ্নের সময়।দেশ যখন বহিরাগতদের খপ্পরে ছিল,তাদের রঙ ছিল আলাদা,রক্ত ছিল চেনা,ভাষা ছিল দুর্বোধ্য—শিশুরাও চিৎকার করে বলত,“বিদেশি! বিদেশি!”কিন্তু আজ?আজ আমরা মাথা নত করি তাদের কাছে,যারা বাংলার বদলে অনর্গল ইংরেজি বলেক্ষমতার সিলমোহর বসায়;যারা ভিনদেশে গড়ে তোলে দ্বিতীয় আবাস,এখানে রেখে যায় কেবল নির্দেশ।আমি বলি না—ইংরেজি শিখো না।বলি না—বিদেশে যেও না।আমি নিজেই এক দ্বিধাগ্রস্ত বৃদ্ধ—অন্ধ কীভাবে আরেক অন্ধকে পথ দেখায়?তবু প্রশ্ন করি—আমরা কোন যুগে দাঁড়িয়ে?শিকারযুগ ইতিহাস,কৃষিযুগও অতীত।এখন ভাষার যুগ—যেখানে জিহ্বাই অস্ত্র,উচ্চারণই পাসপোর্ট,বাক্যই সীমান্ত অতিক্রমের ভিসা।আমি জানি না—জন্ম উত্তম, না মৃত্যু;স্বর্গ, না নরক;ঈশ্বর, না শয়তান।তবু জানি—মৃত্যু এক নিশ্চিত ভাষান্তর,অন্ধকারের গহ্বর থেকেআরেক অজানা উচ্চারণে যাত্রা।সেদিনও থাকবে রাজা,থাকবে বিরোধ, প্রতিরোধ।সেদিনও কেউ নিরাপদ দূরত্বেবিদেশে গুছিয়ে রাখবে তার আশ্রয়।প্রশ্ন একটাই—ভাষা কি শুধু অলংকার?যাদের জয় সর্বত্র,তাদের কাছে কি মাতৃভাষা কেবল স্মৃতিফলক?বাংলা এখনো বেঁচে আছে—গরিবের উচ্চারণে,ইংরেজি না-জানা কবির স্বপ্নে,ইনকিলাব-ধ্বনি তোলা সর্বহারার কণ্ঠে।আমি একটি জীবন লিখেছি এই ভাষায়।তবু যারা আমাদের শাসায়—আমরা কি তাদের বাপের খাই?না—আমরা খেয়েছি মায়েরটাই।আমাদের কোনো দুঃখ নেই—কারণ ভাষা এখনো প্রজ্বলিত;উচ্চারণে এখনো আছে আগুন,লজ্জা আছে,আছে প্রতিরোধ।
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে প্রাকৃত ভাষা থেকে আজকের এই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। তখন ওপরতলার কেউ এই ভাষায় কথা বলতো না। এমনকি এতো বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বলা যায় এই ভাষাটি আজো উচ্চবর্ণ ও বিত্তের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে পারেনি। এখনো এই ভাষা অনেকটাই অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। এই ভাষায় কোনো পুণ্যশ্লোক রচিত হয়নি, রচিত হয়নি কোন ধর্মগ্রন্থ কিংবা উপগ্রন্থ। তাই উচ্চবর্ণ ও বিত্তের মানুষের কাছে এই ভাষা তেমন আদর পায়নি। কি হিন্দু কি মুসলমান, সমাজের ওপরতলার মানুষ বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চলতো। এদের কাছে সংস্কৃত ও উর্দু আভিজাত্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ছিল। শিক্ষাদীক্ষা, চাকরিবাকরি, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত পরিবারবর্গ কারো কাছেই বাংলা ভাষা আদরীয় ছিল না। মূলত মুসলিম পরিবার হলে উর্দু আর সনাতন পরিবার হলে সংস্কৃতের দিকে ধাবিত হতো। ‘বাংলার বাঘ’ বলে পরিচিত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক লক্ষ্ম অধিবেশনে উর্দুতে জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার কারণে সেদিন তার কপালে ‘বাংলার বাঘ’ উপাধি জুটেছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, লিয়াকত আলী খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কিংবা খাজা নাজিমুদ্দিনসহ কোন অভিজাত পরিবারের অন্দরে—বাহিরে কোথাও বাংলা ভাষার চিন্তাচর্চা ছিল না। এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও বাংলা ভাষার কারণে বিদ্যাসাগর উপাধি পাননি। সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্যই তাকে এই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি প্রদান করা হয়েছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত (১৮৫৭) হওয়ার পরও বাংলাকে স্বতন্ত্র ভাষাবিভাগের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। দীনেশচন্দ্র সেনের পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের সংগ্রহশালা দেখে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাপর বিদ্যা ও বিষয়ের অধ্যাপকেরা নাক শিটকাতেন। তারা বাংলা ভাষায় রচিত এইসব পুঁথিসাহিত্যকে খুব একটা প্রয়োজনীয় বিবেচনা করতেন না। এজন্য ‘আশুতোষ স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে দীনেশকে নিদারুণ দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালেও (১৯২১) বাংলাকে স্বতন্ত্র ভাষাবিভাগের মর্যাদা না দিয়ে সংস্কৃতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কমবেশি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনি সংস্কৃত ভাষা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন; লিখেছিলেন ‘অষ্টাধ্যয়ী ব্যাকরণ’। কিন্তু বাংলা ভাষাভাষীর কাছে বাংলা ভাষা গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে বহু সময় লেগে যায়। বাংলা ও সংস্কৃত পাশাপাশি একই অঞ্চলের সমসাময়িক ভাষা হলেও ভাষা দুটি সমভাবে সমকালে সমমর্যাদা পায়নি। বাংলা ভাষা ছিল বরাবরই উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার। চর্যাপদের মতো কিছু কবিতা বাঙালির হাতে রচিত হলেও বাংলা ভাষাতত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করেছিল মূলত অবাঙালি ইউরোপিয়ানদের হাত ধরে। বাংলা ভাষাতত্ত্বের সূচনা ঘটেছিল মূলত মানোএল দ্যাঁ আসসুম্পসাঁউ নামের একজন পতুর্গীজ ধর্মযাযকের হাত ধরে। ঢাকার ভাওয়ালে বসে তিনি রচনা করেছিলেন ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা ইন পোর্তুগীজ’ নামের একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটি ১৭৩৪ সালে লিসবন থেকে বেরিয়েছিল। এই গ্রন্থে সর্বপ্রথমে বাংলা বর্ণমালাকে রোমান হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। আঠার শতকের চল্লিশের দশকে বইটি প্রকাশ হলেও বইটির প্রতি বাঙালি সমাজের তেমন আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। এর প্রায় তিনদশক পরে কলকাতার হুগলি থেকে ন্যাথানিয়েল ব্যাসি হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অব বেংগল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৭৮৮) প্রকাশ হয়। এই গ্রন্থে বাংলা বর্ণমালা সর্বপ্রথম ধাতুতে ঢালাই করা হয়। এরপর আস্তেধীরে হলেও বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির আগ্রহ বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে ভালোবাসা। বাঙালিও বাংলা ভাষাচর্চায় এগিয়ে আসতে থাকে। রাজা রামমোহনের হাতে রচিত হয় ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ (১৮৩৩)। এরপর বাংলা ভাষাচর্চায় অনেকেই এগিয়ে আসেন যেমন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিধুশেখর ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী, মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ দানীউল হকসহ আরো অনেকে। তবে এসব ভাষাবিজ্ঞানীদের ভাষাচর্চার স্থল ছিল মূলত ইউরোপ—আমেরিকা। বাংলা ভাষা বিষয়ক তাদের গবেষণালব্ধ নানা প্রবন্ধনিবন্ধ ইংরেজি…
বিদ্যা ও বিত্তের প্রাচুর্যে ভরা এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে মুনীর চৌধুরীর জন্ম (১৯২৫) হয়েছিল। তার পুরো নাম ছিল আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। পিতা আব্দুল হালিম চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান শাসনামলের জেলা প্রশাসক; পড়াশোনা করেছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পুত্র মুনীর চৌধুরীকেও তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছিলেন; আশা ছিল পড়াশোনা শেষ করে এই ছেলেটি বড় ডাক্তার হবে। কিন্তু না, তিনি ডাক্তার হোননি। বিজ্ঞান পড়ায় তার মন বসতো না; শিল্প—সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিকে তার মনটা কম্পাসের কাটার মতো হেলে থাকতো। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল লাইব্রেরি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। এই লাইব্রেরিতে বসেই তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জর্জ বার্নাডশ থেকে শুরু করে বিশ্বের নামিদামি লেখকের সাহিত্যকর্ম অধ্যয়ন করতেন। এমনকি উর্দু সাহিত্যও তার পাঠের বাইরে ছিল না। কিন্তু দুটি পত্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই মুনীর চৌধুরী একসময় ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আইএ পড়ার জন্য কলেজে ভর্তির চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। ইতোমধ্যে বন্ধুদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ পান। অতঃপর মুনীর চৌধুরী বড় ভাই কবীর চৌধুরীর (১৯২৩—২০১১) পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হোন। এই বিভাগ থেকেই তিনি ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন (১৯৪৭)।২ছাত্রজীবনে মুনীর চৌধুরী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন থেকেই তার মেধার স্ফূরণ ঘটতে থাকে। বিদ্যায়তনিক লেখাপড়াসহ সামাজিক—সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উপস্থিত বক্তৃতা, পত্রপত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ ছাপাসহ নানামুখি কর্মকাণ্ডে মুনীর চৌধুরী সুনাম ও সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় মুনীর চৌধুরী কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হোন। আবাসিক শিক্ষার্থীরা নাস্তিক আখ্যা দিয়ে সব জিনিসপত্রসহ মুনীর চৌধুরীকে হল থেকে বের করে দেয়। এমনকি এই একই অভিযোগে তার জন্মদাতা পিতা আবদুল হালিম চৌধুরীও পুত্রকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেন। তাই বলে পুত্রের প্রতি তার স্নেহের কমতি ছিল না। তিনি নিজে সরকারি চাকরি করতেন। তার নিজেরও নিজস্ব কিছু মতাদর্শ ছিল। সেই মতাদর্শের সঙ্গে হয়তোবা পুত্রের মতাদর্শ মেলেনি। তাই পিতাপুত্রের এই নিদারুণ বিচ্ছেদ। সেই বিচ্ছেদ খুব বেশি সময় দীর্ঘায়িত হয়নি। সক্রিয় রাজনীতি পরিত্যাগ করলে পিতা পুনরায় মুনীর চৌধুরীকে গ্রহণ করে নেন।৩কর্মজীবনের প্রথমদিকে মুনীর চৌধুরী বরিশাল বিএম কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা (১৯৫০) করেন। খুব দ্রুতই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হয়ে আসেন। এই সময়ে ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে। উদুর্কে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে ২১শে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এলে পাক সামরিক সরকার মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে ছাত্রদের হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। ঐ প্রতিবাদ সভার উদ্যোক্তা ছিলেন শহিদ মুনীর চৌধুরী। ঠিক পাঁচদিন পর জননিরাপত্তা আইনে সামরিক সরকার মুনীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। এসময় সহরাজবন্দিদের মধ্যে ছিলেন মোজাফফর আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অজিত কুমার গুহ, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবুর রহমান, রণেশ দাশগুপ্তসহ আরো অনেকে। পরের বছর ১৯৫৩ সনে রাজবন্দিরা জেলখানায় একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অপরাপর রাজবন্দির পরামর্শে রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরীকে জেলখানায় অভিনয় উপযোগী একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। রাত দশটার পর হারিকেন জ্বালিয়ে যে সব ছাত্রবন্দিরা পড়াশোনা করতো সেই সব হারিকেন দিয়েই নাটকটি মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অতঃপর মুনীর চৌধুরী হারিকেনের আলোয় অভিনয়ের উপযোগী একটি একাঙ্ক নাটক ‘কবর’ রচনা করলেন; সৃষ্টি হলো ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক অনন্য দলিল। এই নাটকে দাফন করা ব্যক্তিকেও কবরের ভেতর থেকে ওপরে উঠে আসতে দেখা যায়, দেখা যায় কথা বলতে।৪কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই মুনীর চৌধুরী বাংলায় এমএ…
ছেলের বাবা বললেন, এক হাতে যৌতুকের টাকা আরেক হাতে ছেলে। নইলে— না। মেয়ের বাবা যতোটা অনুনয়ে অনুযোগ প্রকাশ পায়, তার সাধ্য সাধনায় নিজেকে ক্ষুদ্রতম প্রতিপন্ন করতে বিলীন হয়ে বললেন, দেখুন- এতোটা নির্দয় হলে চলে না। ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবুন, এক্ষেত্রে আমার এতোটকু দোষ খুঁজে পাবেন না। হরতালটা এমন অকস্মাৎ ঘটবে কে তা জানতো বলুন? নইলে মাত্র পঁচিশ লক্ষ টাকা সে ব্যাংক থেকে যখন তখন তুলতে পারতাম। কিন্তু এখন তো ব্যাংক তো বন্ধ। তবে ভাববেন না। আগামিকাল নয়টার মধ্যেই পুরোটা পেমেন্ট দেবো আপনাকে। ছেলের বাবা উচ্চ স্বেও হেসে বললেন, শুনুন— আমাদের বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে ‘আজ না কাল, না দেবার তাল’। তা আমার এতো বেশি কথার প্রয়োজন নাই। আমি সোজা মানুষ সোজা বুঝি। শুনুন— শৈশব থেকেই আমি বস্তুবাদী লোক। বিশ্বাসের সঙ্গে আমার এতোটুকুও সখ্যতা নেই। বরং বিশ্বাসের হেয়প্রতিপন্ন রূপ, আমি আমার জন্মদাতা পিতৃপুরুষকেও দেখিয়ে দিতে কার্পণ্য করিনি। তাতে অন্য বাবাদের মতো বাবা আমাকে আহ্লাদে ‘চামার’ সম্বোধন যদিও করেন নি, তবে পৈতৃক সম্পদ রক্ষায় আমার যোগ্যতাকে মৃত্যুর কিছু পূর্বে, লক্ষ টাকার পালঙ্কের মখমলের চাদরে শুয়ে এক নম্বরে রেখেছিলেন। বাবার পরকালটা আনন্দে কাটুক আমিও চাই। কিন্তু আমি আবার বাকির লোভে নগদ পাওয়া মোটেই ছাড়তে রাজি নই। যাক! আর কথা নয়, এবার টাকা দিন আর বিয়েটাও হোক। কিন্তু দয়া করে আমাকে বিশ্বাস অবিশ্বাসের মধ্যে টানবেন না। আমি জানি, এই বিশ্বাস শব্দটা শেষে অদেখা ঈশ্বর পর্যন্ত টেনে নেবে, সেটা আমার অভিপ্রেত নয়।মেয়ের বাবার সব ভাষাই ফুরিয়ে গেল। তবে অন্তরের শেষ জ্বালাটা মেটানোর জন্য তিনি ধরা গলায় বললেন, বুঝতে পারলাম! আপনি শুধু নিরসই নন, বরং পাষাণও বটে। ছেলের বাবা কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে বললেন, কিন্তু আমার দুঃখটা কি জানেন? এতো বড়ো বিচক্ষণ জ্ঞানী সমঝদার হয়েও বুঝতে পারলেন না, হাঁড়িতে রস দেবার পরিবর্তে কাঁটা ফোটানোর উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচানো সহজাত ধর্মের পরিপন্থি?আর ও হ্যাঁ, আরো একটা কথা বলেছেন, আমি নাকি পাষাণ! কিন্তু কেন তা হয়েছি তা একবার জানতে চাইবেন না। মেয়ের বাবা উদগত ক্ষোভ অব্যাহত রেখে বললেন, বুঝতে তো পেরেছি- আপনার ফোকলা মুখে কিছুই আটকাবে না। তবু বলুন না। অপেক্ষা কিসের?ছেলের বাবা বললেন— না— না। বলবো তো অবশ্যই। কারণ সত্য কথা বলতে আমি সংকোচ বা সম্ভ্রমের ধার মোটেই ধারি না। শুনুন তবে ছেলে আমার ডাক্তারি পাশ দিয়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেছে। ব্যাপারটা সহজে হয় নি। আমার মধ্যে যতোটা রস ছিলো ছেলেকে পড়াতে নিঃশেষ হয়ে হৃদয় নামের বস্তুটা শুকিয়ে পাষাণই হয়েছে বটে। আর এটা আমার বিশেষভাবে প্রত্যাশিত। একটা কথা বলে রাখি। আমাকে কাঁটা ফোটানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ ফলটা কিন্তু ভালো হবে না। আমি আবার জেতার ব্যাপারে বেফাঁস কিছু বলতেও কসুর করি না।মেয়ের বাবা বললেন— শুনে খুশি হলাম যে, ভদ্র সমাজের পরিত্যাজ্য উচ্ছিষ্টই আপনার কাছে যথেষ্ট সমাদৃত। বললেন ফল ভালো হবে না! কী করে আর হবে বলুন? গাছের জাতটা যদি বিষের হয়, তার ফলটা আর কি করে অমৃত হয় বলুন? ঠিক আছে আর ফল ফল করে বিফল চিন্তায় আমার কাজ নেই। এবার সসম্মানে বেড়িয়ে গেলেই ভালো হয়। ছেলের বাবা উচ্চস্বরে বরযাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলল— হে মেন সবাই চলে এসো। বাবার আদেশকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস না দেখিয়ে বরও বরযাত্রীদের সঙ্গে বেড়িয়ে গেল।গবার শেষে ছেলের বাবা গেট পাড় হওয়ার পূর্বে মেয়ের বাবাকে উদ্দেশ্য করে চাপা কণ্ঠে বিদ্রুপের সুরে বলল— ফাঁকি দিয়ে আমার ছেলের গলায় মেয়েটাকে ঝুলিয়ে দেওয়ার জোচ্চুরিটা শেষ পর্যন্ত…
অবিনাশ দাসেরই ডোম হিসাবে শুধু নিয়োগ রয়েছে। সরকারি হাসপিতালের ডোম সে। বেতন মাসিক কুড়ি টাকা। এই টাকা ট্রেজারি অফিস থেকে তোলার নিয়ম। সরকারি কর্মচারিরা মাস শেষে বেতন ভাতাদি তোলেন। তার তোলা হয় না। মাসের পর মাস সরকারি খাতায় তার টাকা জমা হয়। জমা হয় বছরের পর বছর। জেলা অফিসের লোকজন অবিনাশ দাসের বেতন বিল করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। কুড়ি টাকার চেক করা বেশ ঝামেলার। অবিনাশ দাসের বাবা ছিলেন সুনীল দাস। তিনিও পুরো জীবন এই পদে মাসিক দশ টাকা বেতনে চাকুরী করে গেছেন। তার টাকাও তোলা হয়নি। রাষ্ট্রের কোষাগারে কত সব লাওয়ারিশ টাকার মিল ও গড়মিল হিসাবে ঐ টাকাগুলোর খোঁজ কারোর জানা থাকে না। অবিনাশ অবশ্য বাবার মৃত্যুর পরে কিছুদিন অফিসে ঘোড়াঘুরি করে দেখেছে। বাবার নামে জমে থাকা টাকা গুলো তোলার জন্য। সরকারি অফিস থেকে টাকা তোলা সহজ কাজ নয়। প্রচুর ঝামেলার কাজ। মুখের কথায়তো আর টাকা দেবে না। এ জন্য কাগজপত্র চাই। দনিয়ার কাগজপত্র। তারপর এটেবিল ওটেবিলে দৌড়াদৌড়ির ব্যপার আছে। তাবৎ জীবনের বকেয়া বেতন তুলতে অফিসের কয়েকজন গম্ভীর মুখে বকশিশ দাবি করে বসে। অবিনাশ বাংলা মালের গন্ধ ছড়িয়ে উপরের পাটির দাঁত বের করে বলে, ছার, বাপের বেতনই ছিলো মাত্তর দশ ট্যাহা, বকশিশ কত দিবো? অবিনাশের মুখের অনিয়ন্ত্রিত বেয়ারা ধরনের থু থু ও মদের কটু গন্ধ তাদের নাকে থাপ্পর মারে। তারা মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। কপাল ঘুচিয়ে বিকৃত স্বরে বলে, রাবিশ! একজন ডোমের সাথে সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের আচরণ কতটা আপত্তিকর বা অসমমান জনক তা এই সময়ের সমাজ ব্যবস্থার শিক্ষিত মানুষেরাও আন্দাজ করতে পারবেন না। অবশ্য অবিনাশ এতে ব্যথিত হয়নি। শিক্ষিত শ্রেণির লোকজনের আচরণের কারণে তার মন ব্যথিত হয় না। এরা হলেন দেবতা। দেবতাদের দোষ নেই। কয়েকদিন এ টেবিল ও টেবিল ঘোড়াঘুরি করে সময় আর শ্রম অপচয় হচ্ছে এই বিবেচনায় বেতনের টাকাটা তুলতে যায়নি। অবিনাশের ঠাকুরাদা কালিপদ দাশ ডোম ছিলেন। সাতচলি¬শের দেশ ভাগের সময় ঐ পদে তার বেতন ছিলো পাঁচ টাকা। বাবার মুখে শুনেছে সেও বেতন তুলতে পারেনি।তাদের সংসার চলে মানুষের লাশ পেলে। অপমৃত্যুর লাশ। বেওয়ারিশ লাশ। হাসপিতালে যে লাশ নিয়ে আসা হয় সেই লাশ থেকে। মর্গে সেই লাশ এরা তুলে আনে। ধাঁরালো ছুরি দিয়ে কাঁটে। তারপর সেলাই করে লাশটিকে ভালো করে প্যাকেট করে তুলে দেয় আত্মীয় স্বজনদের কাছে। আত্মীয় স্বজনেরা বকশিশ দেয়। বকশিশের টাকায় চলে সংসার।মেডিক্যাল কলেজের এই মর্গটিতে কত রকম মানুষ লাশ হয়ে আসে। ধর্ম কর্মের বিচার কি আর লাশের শরীরে লেখা থাকে? লাশ বড় কঠিন জিনিস। মানুষ আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের লাশ একই রকম। লাশের উপরের পোশাক দেখে বোঝা যায় মানুষটি ধনী না গরিব শ্রেণীর। তবে লাশটির শরীর থেকে যখন কাপড় চোপর খুলে নেয়া হয় তখন কিছুই বোঝা যায় না।গরীব শ্রেণীর লাশের আত্মীয় স্বজনও হয় গরিব শ্রেণীর। গরিব মানুষের টাকা নেই কিন্তু ক্রন্দণ থাকে প্রবল। এরা লাশ নেয়ার সময় বকশিশের কথা শুনে হতাশ মুখে তাকায়। একজন মাতাল মরা মানুষটাকে কাঁটাছেড়া করে বকশিশ চাচ্ছে। মানুষটার কী হালটাই না করেছে। আহা! মরা মানুষের শরীরটাকে নিয়ে এসব করে কী লাভ? স্বজনেরা আহত চোখে কাঁদতে থাকে। ভ্যানে লাশটাকে তুলে অবিনাশ দাসকে বলে, টাকা নাই। টাকা পামু কই! অবিনাশ অসহায় সর্বশ্ব হারানো এই সব বঞ্চিত শোকাহত স্বজন শ্রেনীর মানুষের ব্যথা অনুভব করে দ্বিতীয়বার আর উচ্চারণ করে না বকশিশের টাকা! পুরো শ্রমটাই মাটি হয়ে যায়।ধনী শ্রেণীর লাশ থেকেও যে ভালো বকশিশ আসে, তাও না।…