ছেলের বাবা বললেন, এক হাতে যৌতুকের টাকা আরেক হাতে ছেলে। নইলে— না। মেয়ের বাবা যতোটা অনুনয়ে অনুযোগ প্রকাশ পায়, তার সাধ্য সাধনায় নিজেকে ক্ষুদ্রতম প্রতিপন্ন করতে বিলীন হয়ে বললেন, দেখুন- এতোটা নির্দয় হলে চলে না। ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবুন, এক্ষেত্রে আমার এতোটকু দোষ খুঁজে পাবেন না। হরতালটা এমন অকস্মাৎ ঘটবে কে তা জানতো বলুন? নইলে মাত্র পঁচিশ লক্ষ টাকা সে ব্যাংক থেকে যখন তখন তুলতে পারতাম। কিন্তু এখন তো ব্যাংক তো বন্ধ। তবে ভাববেন না। আগামিকাল নয়টার মধ্যেই পুরোটা পেমেন্ট দেবো আপনাকে। ছেলের বাবা উচ্চ স্বেও হেসে বললেন, শুনুন— আমাদের বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে ‘আজ না কাল, না দেবার তাল’। তা আমার এতো বেশি কথার প্রয়োজন নাই। আমি সোজা মানুষ সোজা বুঝি। শুনুন— শৈশব থেকেই আমি বস্তুবাদী লোক। বিশ্বাসের সঙ্গে আমার এতোটুকুও সখ্যতা নেই। বরং বিশ্বাসের হেয়প্রতিপন্ন রূপ, আমি আমার জন্মদাতা পিতৃপুরুষকেও দেখিয়ে দিতে কার্পণ্য করিনি। তাতে অন্য বাবাদের মতো বাবা আমাকে আহ্লাদে ‘চামার’ সম্বোধন যদিও করেন নি, তবে পৈতৃক সম্পদ রক্ষায় আমার যোগ্যতাকে মৃত্যুর কিছু পূর্বে, লক্ষ টাকার পালঙ্কের মখমলের চাদরে শুয়ে এক নম্বরে রেখেছিলেন। বাবার পরকালটা আনন্দে কাটুক আমিও চাই। কিন্তু আমি আবার বাকির লোভে নগদ পাওয়া মোটেই ছাড়তে রাজি নই। যাক! আর কথা নয়, এবার টাকা দিন আর বিয়েটাও হোক। কিন্তু দয়া করে আমাকে বিশ্বাস অবিশ্বাসের মধ্যে টানবেন না। আমি জানি, এই বিশ্বাস শব্দটা শেষে অদেখা ঈশ্বর পর্যন্ত টেনে নেবে, সেটা আমার অভিপ্রেত নয়।
মেয়ের বাবার সব ভাষাই ফুরিয়ে গেল। তবে অন্তরের শেষ জ্বালাটা মেটানোর জন্য তিনি ধরা গলায় বললেন, বুঝতে পারলাম! আপনি শুধু নিরসই নন, বরং পাষাণও বটে। ছেলের বাবা কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে বললেন, কিন্তু আমার দুঃখটা কি জানেন? এতো বড়ো বিচক্ষণ জ্ঞানী সমঝদার হয়েও বুঝতে পারলেন না, হাঁড়িতে রস দেবার পরিবর্তে কাঁটা ফোটানোর উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচানো সহজাত ধর্মের পরিপন্থি?
আর ও হ্যাঁ, আরো একটা কথা বলেছেন, আমি নাকি পাষাণ! কিন্তু কেন তা হয়েছি তা একবার জানতে চাইবেন না। মেয়ের বাবা উদগত ক্ষোভ অব্যাহত রেখে বললেন, বুঝতে তো পেরেছি- আপনার ফোকলা মুখে কিছুই আটকাবে না। তবু বলুন না। অপেক্ষা কিসের?
ছেলের বাবা বললেন— না— না। বলবো তো অবশ্যই। কারণ সত্য কথা বলতে আমি সংকোচ বা সম্ভ্রমের ধার মোটেই ধারি না। শুনুন তবে ছেলে আমার ডাক্তারি পাশ দিয়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেছে। ব্যাপারটা সহজে হয় নি। আমার মধ্যে যতোটা রস ছিলো ছেলেকে পড়াতে নিঃশেষ হয়ে হৃদয় নামের বস্তুটা শুকিয়ে পাষাণই হয়েছে বটে। আর এটা আমার বিশেষভাবে প্রত্যাশিত। একটা কথা বলে রাখি। আমাকে কাঁটা ফোটানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ ফলটা কিন্তু ভালো হবে না। আমি আবার জেতার ব্যাপারে বেফাঁস কিছু বলতেও কসুর করি না।
মেয়ের বাবা বললেন— শুনে খুশি হলাম যে, ভদ্র সমাজের পরিত্যাজ্য উচ্ছিষ্টই আপনার কাছে যথেষ্ট সমাদৃত। বললেন ফল ভালো হবে না! কী করে আর হবে বলুন? গাছের জাতটা যদি বিষের হয়, তার ফলটা আর কি করে অমৃত হয় বলুন? ঠিক আছে আর ফল ফল করে বিফল চিন্তায় আমার কাজ নেই। এবার সসম্মানে বেড়িয়ে গেলেই ভালো হয়। ছেলের বাবা উচ্চস্বরে বরযাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলল— হে মেন সবাই চলে এসো। বাবার আদেশকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস না দেখিয়ে বরও বরযাত্রীদের সঙ্গে বেড়িয়ে গেল।
গবার শেষে ছেলের বাবা গেট পাড় হওয়ার পূর্বে মেয়ের বাবাকে উদ্দেশ্য করে চাপা কণ্ঠে বিদ্রুপের সুরে বলল— ফাঁকি দিয়ে আমার ছেলের গলায় মেয়েটাকে ঝুলিয়ে দেওয়ার জোচ্চুরিটা শেষ পর্যন্ত আর সফল হলো না। তাই না—? মেয়ের বাবা দ্বারবানকে চিৎকার করে বললেন— এই দ্বারবান! গেট বন্ধ করে দাও।
সারা গা ভর্তি গহনা পত্র আর মেহেদিরাঙা হাতে একজন স্বামীকে ধরার সাধনা সব গোল্লায় গেল সোনালীর। শুধু এ মূহুর্তে অপার পারিপাট্যে তার লাজলতিকা দেহ বল্লরী দূর্লভ জীবন বল্লভের নিরাসক্তে অর্থহীন হয়ে উঠল। এ সময় তার মনে হলো যে, এই অর্থহীন জীবনটা আর না রাখাই ভালো। তাই সে ক্ষিপ্র গতিতে আসন ত্যাগ করে, ধুপধাপ শব্দ তুলে উপর তলায় উঠতে লাগলো। ব্যাপারটা মিতার আদৌ ভালো লাগে নাই। ওর মনে সন্দেহ জাগল। তাই সে অন্যান্য বান্ধবিদের বললÑ তোরা একটু বোস। আমি আসছি।
মিতা হালকা পাতলা মেয়ে, সে অতি সহজেই সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল। ততক্ষণ সোনালী উপর তলার বারান্দার রেলিঙের উপর বসে আঁচলটা সেরে নিচ্ছে। এমন সময় মিতা চিৎকার করে বলল- এই সোনালী কি করছিস? পাগল হয়েছিস! না— না— আগে নিচে নাম। আত্মহত্যা করতে হবে না। বরং এমন ছেলের চৌদ্দগোষ্ঠীর মুখে ঝাঁটা মেরে এবার তুই আমার কথা শোন। আমার মেঝভাইকে দেখেছিস কোনোদিন? দেখিসনি তো? তা বেশ। তোকে দেখতে হবে না। আমার কথা বিশ্বাস কর। ওই টিভি সিনেমার শাহরুখ—সালমান খান আরো হাজারটা নায়কের চেহারা এক জায়গায় করলেও আমার মেঝোভাইয়ের চেহারার সমান হবে না। তুই শুধু বল আমার ভাইকে বিয়ে করবি কি না? ৩ মাসের মধ্যে ডাক্তারি বিদ্যের বড় ডিগ্রি বিদেশ থেকে নিয়ে আসবে। বিয়েটা হবে বাবা মার অজান্তে। আজই! এখনই। তোদের দেখাশোনা ফুলশয্যা এসব কিচ্ছুটি হবে না। মেঝোভাইকে আমি এক্ষুণি ফোন করছি দাঁড়া।
মিতা ফোনে বলল— মেঝোভাই তুই যেখানে যে অবস্থায়ই থাকিস আমার বান্ধবী সোনালীদের বাড়িতে চলে আয়। ওপার থেকে মিতার মেজোভাই মানে সকাল বারবার চিৎকার করে বলল— হ্যালো মিতা, তুই ঠিক আছিস তো? কিন্তু সে সব কথার একটা বর্ণ অবধিও মিতার কাছে পৌঁছাল না।
সোনালী বলল, তোর কথায় আমার সাড়ে ষোল আনা বিশ্বাস আছে।
মিতা বলল, তা হলে যেখানে বসেছিলি সেখানেই বসে থাকগে যা।
এরপর মিতা সোনালীর বাবার সঙ্গে কথা পাকা করে ফেলল। সকাল মিতাকে বহাল তবিয়তে দেখে বলল— সে কিরে এমন সংবাদ কেও দেয়? পড়ি কি মরি করে ছুটে এসেছি। এবার বল কি খবর।
মিতা বলল— একটা জীবন তোকে বাঁচাতে হবে।
সকাল আহম্মকের মত মিতার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে বলল— মানে! কি বলছিস? এর মধ্যেই এতটা গুণ আমার মধ্যে দেখলি যে একটা জীবনও বাঁচাতে পারি? তুই ভুল করছিস— অতবড় মহাপুরুষ আমি নই। বরং শিগ্রি বাড়ি ফিরি নইলে বাবা দুটো কানই টেনে ছিঁড়বে। চল্—চল্ হঠাৎ পাশ থেকে মেয়েলী কন্ঠে বাড়ীর বড় বউমা বলল চল বললেই তো চলে যাওয়া যায় না?
লক্ষœী ছেলের মতো আমার সঙ্গে এসো। তোমাকে তুমি বললাম এতে কিছু মনে করো না। কারন বয়সেও একটু ছোট হবে নিশ্চয়ই। আবার নতুন সম্পর্কের সূত্র ধরেও নিশ্চয়ই ছোট। তা আর কথা নয় এবেলা আর দাড়ি কামানো নয়, বরং চিরকালীন প্রথা হিসাবে নাইতে হবেই। চলো ভাই চলো। সকাল কিছু বলার আগেই তার হাত অন্য হাতের কব্জায় চলে গেল। তারপর রাত দশটার সময় তাকে গায়ে সাবান মেখে কয়েক জন মহিলা মিলে নাইয়ে দিল।
তার পর ১২টা ২৯ মিনিটে বিয়েটাও হয়ে গেলো। আর চুক্তি অনুসারে বর কনের বিয়ে হয়ে গেলো ঠিকই কিন্তু কেউ কাউকে চোখের দেখা আর দেখতে পেলো না। সকাল আর মিতা বাড়িতে চলে এলো।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন এত দেরি করলি কেন রে?
মিতা বলল— আর শুন না বাবা। বর কনের বিদায় পর্যন্ত বাধ্য হয়ে থাকতে হলো।
বাবা বললেন— ঠিক আছে। কিছু খেতে হয় যদি খেয়ে ঘুমিয়ে পড় যাও।
মিতা বলল— না বাবা খেতে হবে না। খুব ঘুম পাচ্ছে। এরই মধ্যে পনেরো দিন গত হয়ে গেলো। বর বধুর শুভ দৃষ্টি অসমাপ্তই রয়ে গেল। দুজনার মনেই একই কৌতুহল। যাকে বিয়ে করলাম তার চেহারা চরিত্র কেমন? কিন্তু পাঠক! এই যে কৌতুহল, তা সেটা সেখানেই সীমাবদ্ধ রইলো না। তারা উভয়েই অনিদ্রা আর অনাহারে অরুচি জনিত রোগে ভুগতে লাগল। আমাদের নায়ক দেবদাস সেজে বেরুল ছিপ বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে। অবশ্য মাছ ধরার একটা বাতিকও আছে। আর সে বাতিক শৈশবে মামা বাড়িতে মামার কাছ থেকেই সংগ্রহ হয়েছে। ছোট বেলা মামা বাড়ি গেলেই, মামার একটা আদর্শ সাগরেদ হিসেবে সারাদিন তার পিছু লেগে থাকত।
আর মামাও ভাগ্নেকে বশে রাখার উপায় হিসেবে, উঁচু গাব গাছ থেকে গাব অথবা পেয়ারা পেড়ে সে সব ঘুষ হিসেবে উপস্থিত করত। সে সব সুখের দিন গুলির কথা ভাবতে চোখে জল আসে। সেই বাদাই নদী। আর তার সুস্বাদু মাছ। এখন যেন সব রুপকথার মত কেউ বিশ্বাস করবে না। মামা মাছ ধরতে ব্যাস্ত আর সকাল কাদা মাটি নিয়ে গায় মেখে গড়াগড়ি দিয়ে মজা করত। পরিশেষে টলটলে পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করে মামার শাসনহীন সান্নিধ্যে তার মজার অবধি থাকত না। আজ বড় অশান্তির দিনে সেই বলগাহারা দিনগুলির কথা বেশ মনে পড়ল। তাই তার মনে হয় মনের অশান্তি দূর করতে বাল্যের স্মৃতি বিজরিত সেই বাদাই নদীর পাড়ে যদি অতীতের কিছু ছিটে ফেঁাটা পাওয়া যায় তার অন্বেষণে বাঁধা কোথায়? তাই সে পরের দিন প্রত্যুশেই সকলকে না জানিয়ে মাছ ধরতে বের হলো।
আর এদিকে সোনালি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে প্রায়। সে জন্য সবাই চিন্তিত হল। কিছু দূরেই মামাবাড়ি। একটি মাত্র বোনের একটি মাত্র মেয়ে তার এই অবস্থা চার মামার কানে যেতেই তারা রৈরৈ করে এসে আদরের ভাগ্নিকে ছেঁা মেরে নিয়ে গেল। ছোট মামা নিরব বলল— তোর যত কষ্টই থাক, আমাদের কাছে তা নস্যি। একবার চল আমাদের বাড়িতে, দেখবি দু’মিনিটেই ঠিক হয়ে যাবে। এই বলে তারা ভাগ্নিকে নিয়ে পথে বেরুল।
মামা গাড়ির সামনে দিয়ে একজন বড়শিওয়ালা মাছ নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচটা ইয়া বড় বাইন মাছ, একটা বড় রিটে মাছ, দুটো কাউনে মাছ।
বড় মামা গৌরব বললেন— ড্রাইভার গাড়ি থামাও। গাড়ি থামল। মাছওয়ালা মানে আমাদের সকাল ও থেমে গেল।
সেই কাক ভোরে বেচারা বাড়ি থেকে বের হয়েছিল আর এখন বিকেল চারটে। সারাদিন অভুক্ত মুখখানা রোদে পুড়ে যেন ছাই বর্ণ হয়ে গেছে। তার উপর খেঁাচা খেঁাচা বিশ্রি দাড়ি মোচ! কিছুতেই দেখে মনে হবে না একটা শিক্ষিত ভদ্রলোক সে।
বড় মামা বললেন— কিহে মাছ গুলো বিক্রি করবেন?
সকাল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রয়েছে গাড়ি থেকে অবতরণরত মেয়েটার দিকে। আরে! একি দেখছে সে? এ কি মানবী নাকি স্বর্গের অপ্সরা? এত রূপ কি করে হয়? এদিকে মামা বলেই যাচ্ছেন— কি হে; মাছগুলো বিক্রি কর।
কিন্তু সে প্রশ্নের কোন উত্তর হচ্ছে না।
ছোট মামা নিরব বলল— তমি যাই বল এ ছেলে নিশ্চয় বোবা নইলে প্রশ্ন করেই যাচ্ছ, করেই যাচ্ছ অথচ কোন উত্তর নেই। মেঝোমামা এতক্ষণে সামনাসামনি এসে বলল— ওভাবে হবে না। বোবারা কি কানে শুনতে পায়? বরং এই দ্যাখ আমি আকার ইঙ্গিত করে ওর কথা নিচ্ছি।
এদিকে সকাল শুধু সোমত্ত সুন্দরি মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার গায়ে যেনো রুপ ধরছে না। তার সে রুপ চারদিকে জলন্ত উনুনের খই এর মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বোচারা সকাল সেই রুপ গিলছে তো গিলছেই।
মেয়েটা লজ্জা পেল। এদিকে নিরব— এই—এ—আ—ই ইত্যাদি শব্দ তুলে অঙ্গ ভঙ্গিতে প্রকাশ করল মাছ বিক্রি হবে নাকি? সকাল মুচকি হেঁসে ইশারায় ঠেঁাটটা এদিক ওদিক করে এমন ভাব দেখাল যে ভদ্রলোকেদের কাছে মাছের টাকা পুড়োটা নেই।
বড় মামা রাগ কারে বললেন— এই তোমার মাছের দাম দুই হাজার টাকা। কি দেবে?
সকাল মুচকি হেঁসে বোবাদের মত ইশারায় প্রকাশ করল— আরো পাঁচ‘শ’ লাগবে।
বড় মামা সেটাই কবুল করলেন। কিন্তু তিন ভাইয়ের মোট টাকা যোগ করে হলো মাত্র আঠারো শত টাকা।
সোনালি বলল— মামা আমার কাছে পাঁচ‘শ’ আছে। বড় মামা হতাশ হয়ে বললেন— তাতেও তো হচ্ছে নারে। ছোট মামা বলল— ও মাছের দাম বাইশ‘শ’ টাকা দিলেই দিয়ে দিত। তুমি বেশি বলে ফেললে। বড় ভাই বললেন— চুপ কর। মাছের দোকানে গেছো কোন দিন! গেলে বুঝতে। কিন্তু ওসব কথা থাক। এবার কি করা যায় সেটাই ভাব। আচ্ছা ছোট! একটা কথা ভাবছি— মানে ছোট মামা বলল— আরে ভাবছো কেন। বলেই ফেল না?
বড় মামা বোবাটার কাছাকাছি হয়ে হাত পা নেরে অদ্ভুত ভাবে বললেন— এই টাকাটা নাও আর বাদ বাঁকি টাকা গাড়িতে ওঠো বাড়ি থেকে দিয়ে দেব।
আরে ভেব না, তোমাকে আরও দুশো টাকা সম্মানীও দেওয়া হবে।
অবশেষে সেটাই হলো। সোনালির মামাবাড়িতে মাছ দেখে সবাই খুশি হলো। বরং বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলো বয়স্কদের হারানো বন্ধুর সঙ্গে পুনর্মিলনের আনন্দাশু্রর মত লাঞ্চিত করে তুলল।
বাড়ির বৃদ্ধা গৃহিনী লাঠিতে ভর দিয়ে সকালের সামনাসামনি এসে বলল তুমি কিন্তু কটা ভাত খেয়ে যেয়ো বাবা। আহারে গরিব মানুষ! অভাবের কারণেই এত ভালো মাছ গুলো বিক্রি করেছো। খানিকটা বাড়ির জন্যও নিয়ে যেও। আগে একটু নেয়ে নাও বাবা। ছোট ছেলে বলল মা ও কথা বলতে পারে না। মানে বোবা! মা আহত কণ্ঠে বললেন বলিস কিরে! আহা এত সুন্দর ছেলে কথা বলতে পারে না? তিনি চিৎকার করে বললেন ও বৌউমারা! ছেলেটাকে যত্ন করে খাইয়ে দিও! তার আগে ওর একটু নাওয়ার ব্যাবস্থা করে দাও। সোনালি বলল আমি গোসল খানা দেখিয়ে দিচ্ছি চলো। তার পর সোনালি সকালের কাছাকাছি এসে নাকচেপে একটু পিছিয়ে এসে বলল সারা গায়ে মাছের গন্ধ নানী সাবান দিয়ে ভালো করে গা রগড়াতে হবে। এই বেচারা বোবা। এস আমার সঙ্গে।
নানী খুব খুশি হয়ে সোনালিকে উদ্দেশ্য করে বললেন সোনাই আমার লক্ষ্মীবোন। না—না— পাগল ছাগলের প্রতি দয়া দেখানো খুব ভালো কাজ। বড় মামি বললেন এই সোনাই! তোর মামার রেখে দেওয়া লুঙ্গি পাঠিয়ে দিচ্ছি। বেচারা নেয়ে পরবে তো?
সোনালি বোবাটাকে বার বার পিঠে লেগে থাকা কাদা ইশারায় দেখিয়ে দিচ্ছে কিন্তু কিছুতেই সে বেচারা বুঝতে পারছে না।
তাই কোন দিশা না পেয়ে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেই হাত লাগিয়ে পিঠটা ঘসে দিল।
এতে মুচকি একটু হাসলো বোবাটা।
সোনাই চোখ গরম করে বলল দুষ্টুমি হচ্ছে বুঝি? এর পর খাওয়া দাওয়া হলো। বড় মামা টাকা গুণে বোবাটার হাতে দিতে যাচ্ছে, কিন্তু সে কিছুতেই টাকা নিতে চাইলো না। বেশি জোর করলে সে কান্নার সুরে না যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আবার এ কথাও সে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো যে তার আপন বলতে এ সংসারে আর কেউ নেই। যদি তারা তাকে আশ্রয় দেয় তবে বাড়ির সব কাজ করে দেবে। বাড়ির কতৃ বললেন আহা ও এখানে থাকতে চাইছে তা থাকুক না। যখন মনে হবে চলে যাবে। তবে এখন আর ওকে তাড়িয়ে দিসনে।
মায়ের আদেশ! বাড়ির কেউ আর দ্বিতীয় কথা বলার সাহস করল না।
ছোট মামা বললেন ওকে কি বলে ডাকা যায়? একটা নাম তো দরকার?
মা বললেন তাই তো। একটা নাম না হলে চলে?
বড় বউ হাসতে হাসতে সেখানে এসে বলল ভাববেন না মা। আজ রবিবার না। তা ওর নাম রবি হলে কেমনে হয়?
সবাই সহাস্যে হাত তালি দিয়ে বলল খুব ভালো খুব ভালো। এই না হলে বাড়ির বড় বউ?
সেই থেকে আজ একমাস হলো আমাদের সকাল রবি সেজে এ বাড়ির ফাইফরমাস পালন করে চলছে। তবে বেশি কিছু করতে হয় না তাকে।
এই থালা বাসন মাজা, বাগান সাফ করা এই আর কি।
তবে ছেলেটা অলস নয়। যে কাজেই পাঠানো যাক তা সে ঠিক ঠিক করে দেয়। বোবা হলেও শক্তি তার কম নেই এব্যাপারটা সবাই বুঝতে পেরেছেন। আজ সকালে উঠেই রবি বাগানে গেল। কিন্তু প্রতিদিনের মত আজ আর সোনাই সেখানে উপস্থিত নেই। রবির মনটা খারাপ হয়ে গেল । কারণ সোনাই যেন তার প্রতিদিনের জীবনের রবি। তার মুখটা না দেখলে অথবা একটু হাসি মুখের কথা না শুনলে রবির দিনটাই বৃথা হয়ে যায়।
অবশেষে সে জানতে পারল সোনাইয়ের ভীষণ জ্বর। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। রবি সোনাইয়ের ঘর ঝাড়– দিতে এসে তার অবস্থা অনুমান করে। আবার ঔষধগুলোও তো ঠিক ঠাকই এনেছে দেখছি।
রবি খানিকটা আ—উ করে বোকা হাসিতে দাড়িঁয়ে রইল। সোনাই পাশ ফিরে শুতে শুতে বলল ঠিক আছে যাও। কিন্তু রবি কৌটা থেকে একটা বিস্কুট এনে ইশারায় সোনাইকে খেতে বলল।
সোনাই বলল এখন খাবো না। আচ্ছা ঠিক আছে পরে খেয়ে নেবো যাও।
কিন্তু রবি নাছোর বান্দার মত বিস্কুটটা তার মুখের সামনে ধরেই রয়েছে।
সোনাই মুখে কিছুটা বিরক্তি ফুুটিয়ে বলল আহ্ রবি! তুমি বড্ড জ্বালাতন কর। দাও দাও বিস্কুটটা দাও।
সোনাই তারপরে ঔষধটা সেবন করে শুতে শুতে বলল এখন যাও খুশি তো ? রবি খুব খুশি হয়েছে বোঝাতে একটু হাসল। সোনাই ওর টোল খাওয়া হাসি মুখটা মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিরুপণ করে নিজেও ফিক করে হেসে ফেলল।
সে মনে মনে এটাও বলল রবি তুমি যদি বোবা না হতে আরো আগে যদি দেখা হতো, তাহলে নিশ্চই তুমিই হতে আমার বর।
এমন সময় বড় মামার কলেজে পড়া ছোট মেয়ে এসে বলল এই সোনা আপু। এই অঙ্কটা করে দেনারে। সোনাই বলল আমার এখন মাথা ব্যাথা করছে। রেখে যা করে রাখব।
রাবেয়া বলল বিকেল ৩টার সময় স্যার পড়াতে আসবেন। অঙ্কটা না হলে কিন্তু খুব বকুনি খেতে হবে।
সোনাই বলল ঠিক আছে। এখন তুই যা—না।
এরপর হঠাৎ দুপুর ১২টার সময় সোনাই ঘুুমিয়ে পড়ল।
বেচারি এমন ঘুমিয়ে পড়ল যে, তার কানের কাছে শত ঢাকি সর্বশক্তি দিয়ে ঢাক বাজিয়েও তাকে জাগাতে পারবে বলে মনে হল না। অথচ বড় মামা, মেঝ মামা এবং ছোট মামা ফিস ফিস করে বলল বাড়িতে কেউ জোরে কথা বলতে পারবে না। যদি হঠাৎ কেউ জোরে কথা বলেই ফেলে তা হলে তার জরিমানা হবে। জরিমানা হবে কিন্তু কি যে জরিমানা হবে মেঝো মামা আর তার বড় ভাই কিছুতেই ঠিক করতে পারছেন না।
কিন্তু ছোট ভাই হচ্ছে এ যুগের স্মার্ট ছেলে, সায়েন্স নিয়ে পড়ছে। সেই ছেলেই মেঝ আর বড় ভায়ের মুশকিল আসান করে দিল। সে ছেলে বলল ভাবছ কেন বড় ভাই! আমি আছি না? বড়ভাই রাগত কণ্ঠে বললেন আহা কি ভেবেছিস যখন বলেই দে—না। হতচ্ছারা ভেঁপো ছেলে! এই ঘোর বিপদের সময়ও রসিকতা না করলেই নয়? ছোট ভাই বলল আহ্ বড় ভাই! তোমর আসলে ধৈয্যর্ বস্তটাই নেই।
বড় ভাই এবার অত্যাধিক চটে গিয়ে ছোটটার কান চেপে ধরে বললেন এই হতভাগা। উপদেশ দিচ্ছিস বুঝি? ছোট ভাই চিৎকার করে বললেন খুব লাগছে কিন্তু বড় ভাই!
কানটা ছেড়ে দিয়ে বড় ভাই বললেন তা হলে বল! বল বলছি—
ছোটভাই বলল হঁ্যা বলছি শোন। যে জোরে কথা বলবে তাকে তিন দিন কথা বন্ধ করে রাখতে হবে। ভুলে যদি কথা বলে ফেলে আরও তিন দিনের শাস্তি বেশি বরাদ্দ হবে।
বড় ভাই হো হো করে হেসে উঠে বললেন— আহ্ ছোট ভাই। ভারি বুদ্ধি রাখিস তো? বাঁচালি— ঠিক আছে এবার অন্দর মহলে জানিয়ে আয় কথাটা। অতঃপর ঘটা করে বাড়ির সবাই কে জানানো হলো নির্দেশটা ।
এদিকে বেলা পৌনে দুটোর সময় সোনাইয়ের ঘুম ভাঙল। আর সঙ্গে সঙ্গে বড় মামার মেয়ে রাবেয়া এসে বলল কিরে আপু অঙ্কটা হয়েছে তো? খুব করেছিস, দেখাতাটা দে আমায়Ñ
রান্না ঘর থেকে রাবেয়ার মা মর্জিনা বেগম ডাকলেন রাবেয়া এখানে এসো।
রাবেয়া খাতাটা এতক্ষণ খুলে দেখেনি। এবার কি মনে হওয়ায় খুব জোরে জোরে পাতা উল্টিয়ে দেখল অঙ্কটা দিব্যি কষা হয়ে গেছে।
রাবেয়ার এতক্ষণের থমথমে মুখটা হঠাৎ হাসির উজ্জল আভায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। সোনা আপামনিকে ধন্যবাদ জানানের আগে মায়ের কথাটা শুনে চলে গেল রাবেয়া কি মা? ডাকলে বুঝি?
মর্জিনা বেগম বললেন হ্যা! যাতো মা ফটিকের দোকন থেকে কাচা লঙ্কা নিয়ে আয়।
রাবেয়া বলল আমি এখন পারব না মা। রবিকে বল না এনে দেবে। মর্জিনা বেগম বললেন আহা যাবি তো গেটের সামনেই ফটিকের দোকান। বেচারা রবি সকাল থেকে বহু ফাইফরমাস পালন করেছে। বলি ওর ও তো শরীর নাকি?
মেজো বউ আশালতা মুখ টিপে হেসে বলল— সে তুমি যাই বল না বড় আপা। রবি এসে এ বাড়ির ছোট থেকে বড় সবারই বাবুগিরিটা বেশ বেড়েছে কিন্তু? মর্জিনা বেগম রাগত কণ্ঠে বললেন না—না এতটা মোটেই ভালো নয়। পরের ছেলে বলে সবাই ওকে দু’দণ্ড বসতে দেবে না পর্যন্ত?
রাবেয়া বলল ঠিক আছে এনে দিচ্ছি।
এদিকে রবি সোনাইয়ের ঘর ঝাড়– দিতে গেলে বালিশ থেকে মাথা তুলে বলল শোন তো। এবেলা জ্বরটা আর নেই। মাথা ব্যাথাটাও কমেছে বটে। কিন্তু গায়ে এক রক্তি বল নেই। ডাক্তারকে বুঝিয়ে বলবে। দুচ্ছাই! তুমি তো আবার বলতেই পারবে না। তার থেকে লিখে দিচ্ছি, নিয়ে যাও ডাক্তারকে দিও। ঠিক এমন সময় রাবেয়া সেখানে এসে বলল— অঙ্কটা করেছিস তাহলে?
সোনাই বলল আরে আমি আবার অঙ্কটা কখন করলাম? দাঁড়া! দাঁড়া! তাহলে অঙ্কটা করল কে?
এ ঘরে তো শুধু রবিই এসেছে। আর অন্য কেউ এলেও এ বাড়িতে তোর অঙ্ক কষে দেবে এমন আর কে আছে? ব্যাপারটা বেজায় গণ্ডগোল মনে হচ্ছে তো? ঠিক এমন সময় মেজো বউ সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল— রবি এই স্যান্ডেল জোড়া সেরে নিয়ে এসো না ভাই।
রবি আঁ উ করে যেটা বোঝালো তার অর্থ হয় যে সে স্যান্ডেল অবশ্যই সেরে আনবে। তবে তার আগে সোনাইয়ের জন্য তাকে ডাক্তার এর কাছে যেতে হবে।
মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে একটা ঔষধের ফাইল আর তার সঙ্গে কিছু ফলফলালি নিয়ে হাজির হলো রবি।
সোনাই বলল এত ফল ফলালি কেন এনেছ রবি? ও আমি খেতে পারব না । কিন্তু নাছোর বান্দা রবি ফলের খোসা ছাড়িয়ে একটা পিরিচে নিয়ে এসে এমনভাবে আব্দারের ভঙ্গিতে সেগুলো সোনাইকে খেতে বলল যে সে না হেসে পারল না।
রবি সে হাসি গভীর আগ্রহে দেখল। সোনাইও রবির বিজয় উদ্দীপ্ত উজ্জ্বল মুখটা দেখল। খুব ভালো লাগল তার। এমন মুখকে যে ভালোবাসা যায়, আপনার করে ভাবা যায়, এ ব্যাপারে মন থেকে সে যথেষ্ট স¦ীকৃতি পেল।
তবে দুঃখও হলো। কারণ এত সুন্দর একটা তরুণকে কেন যে বিধাতা জগতে বোবা করে পাঠালেন এই ভেবে। নাইলে কি জানি সোনাই—ই তাকে প্রেম নিবেদন করে বসতো কিনা কে জানে?
মুখ টিপে আর একটু হাসল সোনাই। ধ্যেৎ! সে কি ভাবছে! তার তো বিয়ে হয়ে গেছে। তার বান্ধবী বলেছে, তার বর নাকি স্বপ্নে দেখা রাজপুত্তুরের মত। লজ্জায় সোনাই এর গণ্ড দুটো লাল হয়ে উঠল।
এদিকে রবি স্যান্ডেল নিয়ে পথে বের হলো। কিন্তু যে পথে বসে মুচিরা জুতা সারেন, সে পথে তাদের গ্রামের অনেকেই আসা যাওয়া করে।
দুশ্চিন্তায় রবির মুখটা হঠাৎ নিস্প্রভ হয়ে গেল। কারণ যেখানে সে জুতাগুলো সারাতে যাবে সেখানে থেকে তাদের বাড়ি বেশি দূরে নয়। এমনকি সে পথে দিনে দশবার তাদের বাড়িতে প্রত্যেককে যেতে আসতে হয়।
আজ তার নিঘার্ত ধরা পড়তে হবে। তাই সে পথে এসে দ্রুত তার বেশভূষা পরিবর্তন করল। নকল দাড়ি ও মোচ লাগিয়ে আবার হাটতে শুরু করল। দু মিনিটের মধ্যে গন্তব্যস্থলে পৌছে গেল রবি। একজন বলল বাবু এদিকে আসুন। খুব ভালো করে সেরে দেব। মুচি একদৃষ্টে রবির দিকে চেয়ে থেকে ফিক ফিক করে হেসে ফেলে বলল বাবু আপনার নকল মুচটা বাম পাশে উঠে এসেছে। এদিকে পিছন থেকে একজন বলল এখানে দুটো কাটা মেরে দিন তো ভাই। রবি পিছন ফিরে চাইতেই দেখলো মিতা। মিতাও রবিকে দেখে বলল একি সেজো ভাই তুই? চল বাড়ি যাবি। বাবা মা আমরা সবাই তোর জন্য খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আজ একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে দৈনিক পত্রিকায় । কিন্তু রবি সে কথার কোন জবাব না দিয়ে ছেড়া স্যান্ডেলের ব্যাগটা তুলে নিয়ে দিল ছুট।
পথের মানুষ আর দু’একটা রিকশা ভ্যানকে কৌশলে এড়িয়ে ছুটে চলেছে রবি। আর পিছন থেকে মিতা বলছে এই দাঁড়া— এই দাঁড়া এদিকে পথের মানুষ গুলো ভাবল, চোরটা মেয়েটার নিশ্চয়ই কিছু চুরি করে পালাচ্ছে।
কিন্তু এটাতো হতে দেওয়া যায় না। তাই সবাই চোরকে ধরার জন্য চোরের পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে। সকলের মুখে একটা মাত্রএ শব্দ চোর… চোর… চোর …
রবি দিশেহারা হয়ে পাড়ার রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে মাথা গলিয়ে দিল। কিন্তু ভাগ্য আজ তার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করল। ঝোপের মধ্যে বড় একটা বল্লার চাকে কষে ঢঁুঁ মেরে দেওয়ায় চাকের বাসিন্দারা কঠিন ভাবে প্রতিবাদ করল। তারা আইন হাতে তুলে নিয়ে বিচারের আগেই শাস্তির বিধান জারি করে দিল।
কিন্তু অপরাধির চোখে যন্ত্রণার অশ্রম্ন প্রবাহিত হলেও প্রতিবাদের নিম্ন স্তরের ক্ষীণ শব্দও কান্না হয়ে কণ্ঠ থেকে বের হল না। তাই জীবনে বোবার ভূমিকা পালন করা কত বড় মহত্বের বিষয় আজ তা হারে হারে উপলব্ধি করল সে। এদিকে লোকজন তন্ন তন্ন করে খুঁজছে চোরটাকে। আর চোরটা ঝোপের মধ্যে বল্লার হুল ফুটানো থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একপাশে দিয়ে মারল জোরে ছুট।
হুট করে কে একজন দেখে ফেলল আর অমনি সবাই তার ইঙ্গিতে ছুটতে লাগল। মিতা সবার পিছন পিছন চিৎকার করে বলছে আপনারা ভুল করছেন। উনি কোন চোর টোর নন। উনি আমার ভাই। কিন্তু কে শুনছে কার কথা?
ততক্ষণে চোরটা বড় একট বাড়ির মধ্যে ডুকে পড়েছে। সে বাড়ির কর্তা সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক নিয়ে বের হলেন।
তিনি রাগে মাতৃভাষাটাকে ভুলে গিয়ে ইংরেজিতে বললেন হয়ার ইজ দা থিপ। রাজকেলটাকে ধর সবাই। হঠাৎ পাশের হাসনাহেনার ঝোপটা নড়ে উঠল।
এদিকে রবি ওরফে আমাদের সকাল দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান করে ঘরে ঘরে ঘুরছে।
সোনাই ব্যাপারটা দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। মামা মামিরা সবাই হাহাকার করে ছুটে এলো। সবার মুখে একই কথা এ কেমন ধারা কথা? না এভাবে মানুষ কি করে বাঁচবে? বলি বিজ্ঞানের উন্নতিকে আমরা প্রশংসা করছি এবং করব। তাই বলে এমন ভাবে সংবাদ পত্রের পাতায়ও ভাইরাস ছড়িয়ে মানুষ মারা শুরু করল নাকি?
ছোট মামা তরুন মানুষ। তার কোন ভয়ডর নেই। সে সংবাদপত্রটা ধরতে যাচ্ছে ঠিক তখনই বড়মামা বিকট জোরে ধমক দিলেন এই ছোট! বেশি সাহস দেখিয়ো না। সবার সামনে সোনাই সংবাদপত্র ধরেই অজ্ঞান হয়ে গেল। কিন্তু ছোট মামা কর্ণপাত করলনা । সে সংবাদ পত্র ধরেই উচ্চ স্বরে বলল— আরে একি! এতো দেখছি আমাদের রবির ছবি! ততক্ষণে সোনাই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে বলল মামা! ও রবি নয়! সকাল। তোমাদের ভাগ্নিজামাই! আমার বান্ধবী একটু আগেই ফোন করেছিল। একমাস হলো ওর ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না। ছোট মামা বললেন— মেয়েটার নাম বোধ হয় মিতা তাই নারে ?
অতঃপর সবাই রবির খেঁাজে বের হল। সোনালিও বলল আমিও যাবো মামা।
বড় মামা বললেন চল তবে।
আর এদিক সকাল ঝেঁাপের মধ্যে লুুকিয়ে কেঁদেই চলেছে। অপর দিকে বন্দুক তাক করে তার বাবা বলছেন ভালোয় ভালোয় না বের হলে গুলি করতে বাধ্য হব। ইতি মধ্যে মিতা হাপাতে হাপাতে ছুটে এসে বলল বাবা তুমি কি করছ? ও চোর নয় আমাদের সেজো ভাই। হতভম্ব হয়ে বন্দুক নামিয়ে রেখে একই ভাবে তিনি মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন।
এরমধ্যেই সোনালি এবং তার মামা মামিরা সেখানে উপস্থিত হল। বাড়ির কর্তা বললেন আপনারা কারা? মিতা এগিয়ে এসে বলল বাবা আমাকে ক্ষমা করো। নিরুপায় হয়ে বান্ধবীর সাথে সেজো ভাইকে বিয়ে দিয়েছি।
সোনালি বাবাকে সালাম করবি আয়। বাবা তার বউমার দিকে কিছু সময় চেয়ে থেকে ফিক করে হেসে ফেলে বললেনÑ এমন সুন্দর মেয়ে তোর বান্ধবী তা আগে বলিস নি কেন?
এই হতভাগা বেড়িয়ে এসো। এই তোমরা কে কোথায় আছো। এস শিগ্রি। বউমাকে বরণ করে ঘরে তোল।
© ২০২৫ bongochokh.com | Developed by: Sajedul Islam
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
