বাঙালীর হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পাবনা জেলার সাগরকান্দিতে ১৪তম বছরের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নপম ফাউন্ডেশন এর ‘নপম বইমেলা’। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনে পূর্বের মতোই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে পাবনা জেলার বৃহত্তম প্রতিযোগিতা ‘সেরা প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম’, ‘আর্ট ক্যাম্প কুটুম’, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং গুণীজন সম্মাননা সহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মেলায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী সহ সর্ব সাধারণের উৎসবমুখর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ বছর মেলায় ১৭টি স্টলের মধ্যে বইয়ের স্টল ছিলো ১৪টি, তারমধ্যে কলি প্রকাশনী, ফুলকি, দীপশিখা প্রকাশ, আমাদের সুজানগর, বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরি, চায়ে বাখরখানি, মাশুন্দিয়া ভবানীপুর বিজ্ঞান স্কুল, মানবসেবাই বড় সংগঠন ও লাইব্রেরি, উৎসর্গ ফাউন্ডেশন, স্মৃতি সংগ্রহ, জ্ঞানকৃঞ্জ, সুপ্তশিখা সমাজ কল্যাণ সংস্থা, ইসলামী বই ঘর উল্লেখযোগ্য।
সমাপনী উৎসবে প্রধান আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন দেশবরেণ্য কবি, চিন্তক ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। তিনি আর্ট ক্যাম্প কুটুমের উদ্যোগে পাবনা জেলার সাগরকান্দিতে মৃতপ্রায় ঐতিহ্য তাঁতপল্লী, কুমোরপল্লী পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তাদের জীবন যাপন, শিল্পের বর্তমান দশা, করুণ পরিণতির কারণ, উত্তরণের উপায় গ্রামবাসীর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেন। রাষ্ট্র তার জনগণের জীবনধারণের মান উন্নয়নে কাজ করুক, সেই দাবি তোলেন। নপম বইমেলার সমাপনী সভায় অংশ নিয়ে গণঅভ্যুত্থানে প্রান্তিক কৃষক ও নারীর ভূমিকা শীর্ষক দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। আলোচনায় তিনি বলেন, জনগণের উর্দ্ধে কোনো আইন হতে পারে না, জনগণের জন্য দেশ গঠন করতে হবে। কবি ফরহাদ মজহারকে ঘিরে দিনভর গ্রামে উৎসবের পরিবশে সৃষ্টি হয়। উৎসব হতে তাঁকে ‘প্রান্তজনের সখা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সমাপনী উৎসবে বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ সহকারী এটর্নি জেনারেল মো. আরিফ খান, বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক ড. কাজল রশীদ শাহীন, কবি, গবেষক ও সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ, নপম ফাউন্ডেশন এর প্রধান উপদেষ্টা কবি আখতার জামান, কবি আলমগীর খান, কবি আলাউল হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রব। সঙ্গীত পরিবেশন করে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী, ভাস্কর ও নন্দন চিন্তক বিপ্লব দত্ত, কাওছার আহমেদ সহ স্থানীয় বাউল গোষ্ঠী।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ আরিফ খান শিক্ষার্থীদের সংবিধান ও বই পড়ার গুরুত্ব শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বলেন, নতুন দেশ গঠনের জন্য তরুণদের সংবিধান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে। পাঠ্যবই বই পড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল বই পড়তে হবে। সংবিধান নতুন হোক, সংস্কার হোক, তার সাথে সম্পৃক্ত হতে হলে বিদ্যমান সংবিধানও পড়তে হবে। বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক ড. কাজল রশীদ শাহীন বাংলাদেশের নবজাগরণে গ্রামের সম্পৃক্ততা শীর্ষক আলোচনায় বলেন,
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক কবি ইমরান মাহফুজ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আমাদের করণীয় শীর্ষক আলোচনায় বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তের দাবি ছিলো, সেটি কেবল একদলের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে আরেক দলকে দেওয়া নয়- হাট, মাঠ, ঘাট, নদী, খাল বিল দখল মুক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত শিক্ষা বিতরণ করতে হবে, ক্লাবগুলোকে, লাইব্রেরিগুলো, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, তাদের স্বাধীন কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। কথাসাহিত্যিক ফয়সাল আহমেদ বলেন, প্রাণ-প্রকৃতি, জীব-বৈচিত্র রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। স্থানীয় নদীগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে নপম প্রধান উপদেষ্টা কবি আখতার জামান বলেন, নপম মানুষ গড়ার কাজটি করে যাচ্ছে। সমাজের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলার কর্মটি করছে, সমাজের টিকে থাকার উপাদান তৈরি করছে। নপম বা এর মতো সুকোমল বৃত্তি চর্চা থেমে গেলে সমাজও থেমে যাবে। আমাদের উচিত এই ধারাগুলো সজীব রাখা।
সভামূখ্য হিসেবে নপম ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান কবি রেজাউল করিম শেখ বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে এবারের আয়োজনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাঙালির হাজার বছরের প্রীতিময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লালন করে সম্প্রীতির সমাজ গড়তে ভূমিকা রাখবে। তরুণদের অবশ্যই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের পুনর্বিন্যাস বিষয়ে ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। নপম ফাউন্ডেশন যে উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছে, সেটি ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য সংগঠনগুলো বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা জারি রাখলে দেশ সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়ক শক্তি পাবে।
তিনদিনের এই কর্মযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, সুজানগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ। সমাপনী উৎসবে তিনি বলেন, পাবনার সাগরকান্দিতে দেশের বিগদ্ধজনের এই উপস্থিতি শুধু সুজানগর উপজেলা নয়, পুরো পাবনা জেলাকে সম্মানিত করেছে। সঞ্চালনায় ছিলেন বেড়া সরকারি কলেজ এর প্রভাষক আজাদ হোসেন, সাংবাদিক মোখলেছুর রহমান, নপম নির্বাহী সদস্য আরাফাত রহমান, রবিউল ইসলাম।
এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন সাগরকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম মোল্লা, বিএনপি নেতা আব্দুল মজিদ খান, ইউনিয়ন জামায়াত সভাপতি মোঃ আব্দুল মালেক, নপম উপদেষ্টা আতাউর রহমান বাবলু, শুভার্থী আব্দুল মজিদ মুন্সী, স্থায়ী পরিষদ সদস্য কবি নাজমুল হোসেন নয়ন, গবেষক ইসমাঈল হোসেন, বইমেলা আয়োজন কমিটির সদস্য সচিব আরাফাত রহমান প্রমূখ।
এবারের আয়োজনে গুণীজন সম্মাননায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখায়, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন পাবনা এর আহ্বায়ক বরকতউল্লাহ ফাহাদ এবং সদস্য সচিব মনজুরুল ইসলাম কে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে সুজানগর ও আমিনপুরের ১৫ জন জুলাই যোদ্ধাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রাপ্ত জুলাই যোদ্ধারা হলেন, মোখলেছুর রহমান, মীর মুহাম্মাদ তাহমিদ, দানিয়াল শেখ, বাদশা মন্ডল, দ্বীপ মাহবুব, রাকিবুল হাসান রাজ, তাসফিয়া মোকাররমী, মিম খাতুন, মাসুম, মনিরুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন মন্ডল, আরিফুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, জীলহ্বজ, আল আমিন ।
বিগত ১৪ বছর ধরে বইমেলার সঙ্গে যুক্ত করে আয়োজন করা ‘নপম সেরা প্রতিভা’ নামে সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম। এ বছর এ প্রতিযোগিতায় ১০টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে কবিতায় চ্যাম্পিয়ন সুধীর ঘোষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়মা তাহসিন, রানার্স আপ শিখা একাডেমির শিক্ষার্থী আয়শা খাতুন, কোরআন তেলাওয়াতে চ্যাম্পিয়ন ইসলাহুল উম্মাহ ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আবু দারদা, রানার্স আপ একই প্রতিষ্ঠানের আব্দুল্লাহ মিকাইল, কোথায় তার ঠিকানায় চ্যাম্পিয়ন সুধীর ঘোষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমি রানী হালদার, রানার্স আপ একই প্রতিষ্ঠানের রিমি আক্তার, ব্যবহারিক বাংলায় চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ যথাক্রমে সুধীর ঘোষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ফাতেমাতুজ জোহরা ও রাফিয়াতুল জান্নাত, গানে চ্যাম্পিয়ন সাগরকান্দি রিয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিহাদ প্রামাণিক, রানার্স আপ সাগরকান্দি ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সাকিবুল ইসলাম, মন থেকে মনন খুঁজিতে চ্যাম্পিয়ন মাশুন্দিয়া ভবানীপুর বিজ্ঞান স্কুলের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তাকি, রানার্স আপ একই প্রতিষ্ঠানের রাইসা আক্তার হন।
আর্ট ক্যাম্প কুটুম পাবনাতে প্রথম ‘আর্ট ক্যাম্প এবং রেসিডেন্সি’; এখানে দেশের তরুণ শিল্পীগণ নপম-এ আবাসান গ্রহণ করে পাবনা জেলার ভূ-বাস্তবতায় তাদের শিল্পকর্ম সম্পাদন করেন। নপম ফাউন্ডেশন এর স্থায়ী পরিষদ সদস্য কবি ও চিত্রশিল্পী নাজমুল হোসেন নয়ন এর নেতৃত্বে এতে কিউরেটর হিসেবে ছিলেন ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট নাছির আহমেদ, অংশগ্রহণ করেন শিল্পী অনুপম দাশ এবং নূর হোসেন। আর্ট ক্যাম্প কুটুম সাগরকান্দির মৃতপ্রায় ঐতিহ্য তাঁতশিল্প এবং মৃৎশিল্প বিষয়ক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার সহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দের নিকট এর ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে শিল্পের সাথে জড়িত মানুষগুলো তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
এবছর সেবা মাল্টিকেয়ার হসপিটাল লিমিটেড এর সহযোগিতায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প এবং উৎসর্গ ফাউন্ডেশন এর সহযোগিতায় বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রায় ১০০ রোগি চোখের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন এবং বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা কার্যক্রমে ৩২০ জন রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেন।
উল্লেখ্য নপম ফাউন্ডেশন তরুণদের উদ্যোগ। অত্যন্ত তরুণ বয়স হতে উদ্যোক্তারা একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনে কাজ শুরু করে। গ্রামের স্কুল মাঠে পত্রিকা পড়ানোর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি দীর্ঘ চৌদ্দ বছর যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিখা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার, গ্রাম ভিত্তিক রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা, রক্তদান, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ কার্যক্রম, বইমেলা, পত্রিকা প্রকাশ, পাঠচক্র পরিচালনা, শিক্ষা সহায়তা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তা মেরামত, দুঃস্থ কল্যাণ, শ্রমজীবী মানুষের বিনোদন ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন কল্যাণকর্ম পরিচালনা করে আসছে।
© ২০২৫ bongochokh.com | Developed by: Sajedul Islam
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
