একান্ন বছরের জীবনকাল পেলেও ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০—১৯৩১) ছিলেন দুই শতাব্দীর মানুষ। উনবিংশ শতাব্দীতে সিরাজগঞ্জের বাণীকুঞ্জে জন্মগ্রহণ (১৩ জুলাই) করেছিলেন। হৃষ্টপুষ্ট রুপে জন্ম নিয়েছিলেন বলে নানাজান নাম রেখেছিলেন ‘রোস্তম’ আর নানি গোলাম বানু তার নাম রেখেছিলেন সেরাজুদ্দিন। কেউ কেউ লালমিঞা কিংবা গোলাপমিঞা নামেও সম্বোধন করতেন। মমতাময়ী মাতা নুরজাহান খানম সোহাগ করে পুত্রের নাম রেখেছিলেন ইসমাইল হোসেন। জন্মস্থানের মমতাকে ধারণ করে কালে এই পুত্র হয়ে উঠেছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী।
দুই
অল্প কিছুদূর বিদ্যায়তনিক (নবম শ্রেণি) পড়াশোনা করলেও তিনি মূলত স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত হয়েছিলেন। একবার স্থানীয় ‘জ্ঞানদায়িনী ছাত্র সমিতি’র শিক্ষক রাসমোহন নাথ ছাত্রজীবনের কর্তব্য প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বক্তব্য শুনতে চেয়েছিলেন। কেউ সাহস না পেলেও সেদিন ইসমাইল হোসেন সিরাজী বক্তব্য দিয়ে তার শিক্ষককে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সিরাজীর শিক্ষক মন্তব্য করেছিলেন- ‘কালে এই বালক অসাধারণ তেজস্বী বাগ্মী হইবেন।’ সিরাজীর জীবনে তার শিক্ষকের ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। জনশ্রম্নতিতে জানা যায়, বাল্যকালে সিরাজী নাকি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে বাগানে গিয়ে বৃক্ষরাজিকে মানুষ কল্পনা করে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতেন। পাঠ্যবই পড়তে ভালো না লাগলেও পাঠ্যবইয়ের বাইরের পুস্তকাদি তিনি ছোটবেলা থেকেই স্কুল কামাই দিয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন। তার পাঠতালিকায় ছিল ‘সদ্ভাব শতক’, ‘হেলেনা উদ্ধার’, ‘ভারতমঙ্গল’, ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘বৃত্তসংহার’, ‘মেঘনাদ বধ’ ইত্যাকার গ্রন্থাদি এমনকি ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্য তিনি এতোবার পড়েছিলেন যে, তার প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। সিরাজগঞ্জ বি. এল হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি গ্যারিবাল্ডি, ম্যাটসিনি, ওয়াশিংটন, রবার্ট ব্রুস, তাইমুরলঙ্গ, খালেদ, নেপোলিয়ান, মোহাম্মদ আলী পাশা, জুলিয়াস সিজার ইত্যাকার খ্যাতনামা মনীষীর জীবনচরিত পাঠ করেছিলেন। একসময় মানচিত্র দেখায় তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করতেন এবং বিভিন্ন দেশের পাহাড়—পর্বত, নদনদী, খালবিল, পথঘাট, ইতিহাস—ঐতিহ্য, নানাকিছু তিনি খুঁটিয়ে খঁুটিয়ে দেখতেন আর কীভাবে ইউরোপে যাত্রা করা যায় সেই চিন্তায় মগ্ন থাকতেন।
তিন
মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও ফার্সির পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষাও তিনি ভালোভাবে আত্বস্থ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্য ভালো করে বুঝতে হলে সংস্কৃত ভাষা শেখাও তিনি আবশ্যিক বিবেচনা করতেন। তাই বলা যায়, বাল্যকাল থেকেই তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, অভিধান, সনাতন ধর্ম গ্রন্থাদি যেমন বেদ, মনুসংহিতা, উপনিষদ ইত্যাদি পঠনপাঠনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। রামায়ণ—মহাভারতের মতো বড় বড় মহাকাব্যও নাকি তিনি দ্রুত শেষ করে ফেলতেন। একবার গিরিশচন্দ্র সেন সিরাজগঞ্জের ব্রাহ্মপ্রচার সভায় প্রচার করেছিলেন যে, ‘হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর পরও শ্রীচৈতন্য, নানক, কবীর, মার্টিনলুথার, রামমোহন প্রভৃতি বহু পয়গম্বর জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।’ গিরিশবাবুর কথায় দুঃখ পেলেও প্রতিবাদ করার সাহস কারো ছিল না। সিরাজী সেদিন শক্তভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- ‘‘তাহারা এমন কোন সত্য, এমন কোন তত্ত্ব প্রচার করিয়াছেন যে, যাহা কোরান হাদিসে নাই? তাহারা যে তিনদিন যাবৎ ‘একেশ্বরবাদ’, ‘জাতিভেদ’, ‘সাম্যের’, বিষয় ও ‘স্ত্রী জাতির মুক্তির কথা’ প্রচার করিলেন, ‘পৌত্তলিকতার’ বিরুদ্ধে বাণী ছড়াইলেন তাহা কি ইসলামের কথা নহে? রামমোহ রায় কি কোরান হাদিস হইতেই ব্রাহ্ম মত গ্রহণ করেন নাই?’’ তৎকালীন সময়ে সিরাজগঞ্জে একবার গো—রক্ষা সমিতির আন্দোলন চলছিল। সিরাজী ‘তৈষ্ঠা উর্দ্ধং অষ্টমাং গৌ’ প্রভৃতি শ্লোক আবৃত্তি করে যঞ্জ ও মধুপর্কে যে একসময় গোমাংস ব্যবহার হতো তা প্রমাণ করে দেখান। এগুলো ছিল সিরাজীর বহুল পঠনপাঠন ও পাণ্ডিত্যের প্রমাণ।
চার
মানুষের দুঃখকষ্টে সিরাজীর মনটা কেঁদে উঠতো। ফকির—মিসকিন, দুখীদরিদ্র মানুষকে তিনি অকাতরে দান করতেন। টাকা না থাকলেও ধার করে এনে দান করতেন। দরিদ্রের পড়াশোনা, বিয়েসাদি, চিকিৎসা, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এমনকি কন্যাদায়গ্রস্ত ব্যক্তিকে স্ত্রীর গহনা বন্ধক কিংবা বিকি্্র করেও দান করতেন। ‘শিরাজী—চরিত’ গ্রন্থের প্রণেতা এম সেরাজুল হক লিখছেন- ‘একবার যশোহর জেলার এক ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক কন্যাদায়গ্রস্ত হইয়া প্রার্থী হইলে স্ত্রীর গহনা বন্ধক রাখিয়া তাহাকে ১৫০.০০ টাকা দিয়াছিলেন।’ কেবল ব্যক্তি নয়, দেশের দুঃখ দেখেও তার মনটা কেঁদে উঠতো। ‘আমরা পরাধীন কেন’- এই প্রশ্ন আবাল্য সিরাজীর বুকের ভেতর জমাট বেঁধে ছিল। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার বোধ ও ভাবনা জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যে বয়সে আমোদপ্রমোদ, সুখসঙ্গ উপভোগের কথা, সেই বয়সে তিনি দেশ নিয়ে, দেশের জনমানুষের স্বাধীকার চেতনা নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হলেন, রচনা করলেন ‘অনল—প্রবাহ’ এর জ্বালাময়ী সব কবিতা। মুনশী মেহেরউল্লাহ সিরাজীর এই সব কবিতায় মুগ্ধ হয়ে নিজ ব্যয়ে কবিতার বই প্রকাশ (১৯০০) করে দিলেন।
পাঁচ
পূর্ববঙ্গের মানুষ হলেও বঙ্গভঙ্গে সিরাজী নিদারুণ দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি পুরো বঙ্গদেশকে একসঙ্গে দেখতে চেয়েছিলেন। এসময় তিনি কংগ্রেস করতেন এবং প্রবলভাবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করতেন। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ সিরাজীকে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ফিরিয়ে আনার জন্য টাকাপয়সা, সহায়সম্পদসহ নানা ধরনের প্রলোভন দেখান। এমনকি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মতো সম্মানজনক চাকরির পদ নিয়ে প্রস্তাবও করেন। কিন্তু সিরাজী এতো বড় লোভনীয় প্রস্তাবও ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয় সিরাজীর কাছে কখনো প্রাধান্য পায়নি। সিরাজীর কাছে প্রাধান্য পেয়েছে তার দেশ, দেশের স্বাধীনতা, দেশের মানুষের স্বাধীনতা। মুসলিম জাগরণের কবি হলেও সিরাজীর মধ্যে বঙ্কিমের মতো সাম্প্রদায়িক সাহিত্য ভাবনা ঠাঁই পায়নি। তিনি ‘আর্য্য বংশধর হিন্দুর সন্তান’ ও ‘ভুবন বিজয়ী বীর মুসলমান’ উভয় সম্প্রদায়কে আহবান জানিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার ‘অনল—প্রবাহ’ জনমানুষের মধ্যে জায়গা করে নেয়। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯০৯) প্রকাশ হলে ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে এবং সিরাজীর বিরুদ্ধে ১২৪ (ক) ১১৭ ও ১৫৩ ধারায় মামলা দায়ের করে। এই মামলার বিচারক মি. সুইনহো সিরাজীকে দুবছর সশ্রম কারাদণ্ড (১৯১০) প্রদান করে। এই প্রথম একজন ভারতীয় কবি যিনি স্বাধীনতার পক্ষে কবিতা লেখার জন্য সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। পরবতীর্তে ‘অগ্নিবীণা’র রচয়িতা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও এই একই বিচারক মি. সুইনহো সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছিল।
ছয়
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সিরাজী কারামুক্ত হোন। এই সময়ে তিনি তুরস্কে গমন করেন। তুরস্কে গমন করলেও তার বুক জুড়ে ছিল এই দেশ ও দেশের মানুষ। তুরস্কে বসে তিনি ‘জন্মভূমি’ কবিতায় জন্মভূমির উদ্দেশ্যে লিখলেন- ‘রেখ মা ! দাসেরে মনে শুধু এই আকিঞ্চন।’ ১৯১৩ সালের ১৫ জুলাই সিরাজী দেশে ফিরে এলেন। বছর কয়েকের মধ্যে নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২০) প্রকাশ হয়। ‘অগ্নিবীণা’ পাঠ করে সিরাজী এতোই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, নজরুলের নামে মানিঅর্ডারে দশটি টাকা উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। সেই সাথে আরো লিখেছিলেন- ‘তোমার লেখা পড়িয়া সুখী হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরাইয়া দিও না, ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।’ নজরুল চোখের জলে সেই দশটি টাকা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন।
সাত
ফরিদপুর বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সিরাজীর সঙ্গে নজরুলের সরাসরি প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেদিন নজরুল ইসলাম দুইহাতে সিরাজীর পায়ের ধুলি মুখে তুলে নিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি সিরাজীকে এতোই ভালোবাসতেন যে, তাকে পিতা বলে স্মরণ করতেন। কবি মজিদ মাহমুদ নজরুল জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘তুমি শুনিতে চেয়ো না’য় নজরুলের জবানিতে লিখছেন- ‘আমার আগে সিরাজী সাহেবই একমাত্র কবি যিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে দুই বছর জেল খেটেছেন, তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তাঁর হৃদয়ও ছিল অনেক বড়, আমি অনেক নারীকে মা বলে সম্বোধন করেছি, কিন্তু পিতা বলে একমাত্র তাঁকেই স্মরণ করেছি।’ সিরাজীর মৃত্যুর (১৭ জুলাই ১৯৩১) পরের বছর ১৯৩২ সনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সিরাজগঞ্জে ‘বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলন’—এ সভাপতি হয়ে আসেন। সেই সম্মেলনে সিরাজীকে না পেয়ে বিদ্রোহী কবির হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তা তার অভিভাষণ থেকে বোঝা যায়। সেই অভিভাষণে সিরাজী প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেনÑ‘আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া বাঙলার সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, মনস্বী দেশ প্রেমিকের কথাই বারবার মনে হইতেছে। এ যেন হজ্ব করিতে আসিয়া কাবাশরিফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া।’ আজ ১৩ জুলাই, সেই দেশপ্রেমিক, সেই অন্যতম মহান কবির জন্মদিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যই মূলত আমার এই সামান্য আয়োজন।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী : যার বুক জুড়ে ছিল এই দেশ ও জনপদ
ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ
