আহমদ ছফা : এক নিঃসঙ্গ ধ্রুবতারা

Ahmed sofa Feature Photo

সাহিত্যে কল্পনার আধিক্য থাকলেও আহমদ ছফার সাহিত্য ঠিক সেই ধাঁচে ফেলা যায় না। বরং নিদারুণ বাস্তবতা থেকেই তার সাহিত্যচিন্তার সৃজন হয়েছিল। আহমদ ছফা দৈহিকভাবে আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কেউ দৈহিকভাবে চিরকাল বেঁচে থাকে না। কিন্তু আহমদ ছফা যে সব চরিত্র তার সাহিত্যকর্মে নির্মাণ করে গিয়েছিলেন সেগুলো এখনো বেঁচে আছে। এখনো ঐসব চরিত্র, এখনো ঐ সব মানুষগুলো আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করে, আমাদের চারপাশে চলাফেরা করে। এদেরকে নিয়েই আমাদের যাপিত জীবন, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি। আমরা চাইলেই এদেরকে এড়িয়ে চলতে পারি না। বরং আমাদের চলাই তাদের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। কেননা তারাই নেতৃত্বের আসনে, তারাই সামনের কাতারে কাতারবদ্ধ। বলা যায়, তারাই এই পৃথিবীকে চালায়।

মানুষের ভেতরেও যে আরো একটি মানুষ থাকে- আহমদ ছফা ঐ ভেতরের মানুষটিকে খানিকটা দেখিয়ে দেন। ভালো মানুষের গভীরে যে আরো একটি কদাকার ও কুৎসিত মানুষ থাকে, সুচিন্তার তলদেশে যে আরো একটি কুচিন্তাও প্রবাহিত থাকে, সুন্দর কথার আড়ালে যে কদাকার কুৎসিত কথা বরফের মতো জমাট বেঁধে থাকে- ঐ বিষয়গুলোও আহমদ ছফা তার পাঠককে দেখিয়ে দেন। অর্থাৎ আহমদ ছফা মানুষের ভেতরের ঐ আসল মানুষটিকে দেখিয়ে দেন। ‘গাভীবিত্তান্ত’ উপন্যাসটির কথা বলা যাক। নামে ‘গাভীবিত্তান্ত’ হলেও এই উপন্যাসটি মূলত শিক্ষকদের নিয়ে লেখা, শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে লেখা। এই উপন্যাসে শিক্ষার ভেতরের অন্তসারশূন্যতাকে তিনি দারুণভাবে তুলে ধরেন।

শিক্ষক বলতেই আমাদের চোখের সামনে এক প্রকার সাধক শ্রেণির ছবি ভেসে আসে। তারা বোধহয় সবসময় জ্ঞান সাধনার পেছনে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে, সমাজ ও জাতি গঠনে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু ‘গাভীবিত্তান্ত’ উপন্যাসটিতে তার উল্টো চিত্রই দেখা যায়। এই উপন্যাসে দেখা যায়, শিক্ষকদের একটি অংশ ক্লাবে বসে পরচর্চা ও পরনিন্দা করে সময় কাটায়। কার সাথে কার প্রেম হলো, কার সাথে কার পরকীয়া হলো, কে গভীর রাতে বউয়ের হাতে মার খেলো, কার বউ কার সাথে ইটিসপিটিস করলো, কে কাকে লেঙ মেরে ফেলে দিলো- এই সব বিষয়ই তাদের গল্পগুজুব আর আলাপ—আলোচনার অগ্রভাবে অবস্থান করে। এই উপন্যাসটিতে আহমদ ছফা আরো দেখিয়েছেন যে, এক শ্রেণির নীতিহীন ও আদর্শহীন শিক্ষকরাই শিক্ষা প্রশাসনের পাশে ছায়ার মতো লেগে দিয়ে থাকে। শিক্ষা প্রশাসন তাদের অনুসারী শিক্ষকদের বহুবিধ অপকর্মের কথা জেনেও না জানার ভান করে থাকে। এমনকি চরিত্রের স্খলন ঘটলেও না দেখার ভান করে। মূলত জ্ঞান আবিস্কার ও জ্ঞান বিতরণের চেয়ে ক্ষমতার দিকেই তাদের নজর থাকে বেশি, নজর থাকে স্বার্থগত ব্যাপারে সংঘবদ্ধ হওয়া। তাই বলে যে ভালো শিক্ষক নেই তাও কিন্তু নয়। এরা অনেকটা অসহায় শ্রেণির অন্তর্গত, থাকে দৃশ্যের আড়ালে অনেকটা অপাক্তেয় হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে শিক্ষার একটি অন্তসারশূন্য নিদারুণ দৃশ্যই আহমদ ছফা তার পাঠককে দেখিয়ে দেন।

‘অলাতচক্র’ উপন্যাসে দেখা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন ব্যাংক লুট করে কলকাতায় গিয়ে হাজির হচ্ছে। তায়েবার মতো দেশপ্রেমিক নারীর জীবনপ্রদীপ হাসপাতালের অন্ধকারে নিভে যাচ্ছে। অপরদিকে রওশন আরার মতো একজন কল্পিত মুক্তিযোদ্ধার প্রশংসায় পুরো কলকাতা মেতে উঠছে। আচ্ছা, এমন ঘটনা কি শুধু কলকাতাতেই ঘটেছিল? আমাদের দেশ ও আমাদের সমাজে কি এমন ঘটনা ঘটেনি? ‘মরণবিলাস’ উপন্যাসটিতে দেখা যায়, হত্যা, ধর্ষণ, খুন এমনকি শিক্ষকের স্ত্রী মায়ের বয়সী নারীর সঙ্গেও ব্যাভিচারে লিপ্ত-এমন মানুষই নেতৃত্বে আসছে। আবার এদের অনুসারী কিংবা ফ্যানফলোয়ারেরও অভাব হয় না। এমনকি মিডিয়াও এদের গুণকীর্তনে পিছিয়ে থাকে না। আহমদ ছফা এই উপন্যাসের রাজনীতির ভেতরে যে আরো একটা রাজনীতি থাকে তাই তার পাঠককে জানিয়ে দেন। অর্থাৎ মুখোশের আড়ালেও যে আরো একটি মুখোশ থাকে তাও তিনি দেখিয়ে দেন।

শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতির পাশাপাশি আমাদের শিল্পসংস্কৃতির ভেতরে কীভাবে স্বার্থপরতা ক্রিয়াশীল থাকে তাও আহমদ ছফা দেখিয়ে দেন। ‘নিহত নক্ষত্র’ গল্পে দেখা যায়, যে ছেলেটি পড়ালেখা নিয়ে ভাবে, দেশ নিয়ে ভাবে, সমাজ—সংস্কৃতি নিয়ে ভাবে, সাহিত্যশিল্প নিয়ে ভাবে-সেই ছেলেটি তার ক্যাম্পাসে টিকতে পারছে না। একসময় ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এমনকি পৃথিবী থেকেই বিদায় নিচ্ছে। আহমদ ছফা তার কলমে এই নিদারুণ, এই নির্মম সত্যটাই তুলে আনেন, তুলে আনেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভেতরের ভণ্ডামি, তার স্বার্থপরতা ও কদর্যতার কুৎসিত কদাকার রূপ। সম্ভবত এই কারণেই আহমদ ছফা একজন বুদ্ধিজীবী হয়েও বুদ্ধিজীবী মহলে নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি। এমনকি আজো নিঃসঙ্গই রয়ে গেলেন। তার পাশে কাউকে খুব একটা দেখা যায় না। তিনি একাকি এক আকাশে নিঃসঙ্গ তারার মতো জ্বলতে থাকেন। সেখান থেকে এই পৃথিবীর মাটিকে কিছুটা আলো ঠিকরে পড়ে। আমরা ঐ আলোয় পথ চলতে চাই, আমরা ঐ আলোয় আলোকিত হতে চাই।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।