বিপ্লব দত্ত : এক অনন্য প্রতিভার শিল্পযাত্রা

আলাউল হােসেন
বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চার পরিসরে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা একাধিক শিল্পমাধ্যমে নিজেদের স্বতন্ত্র দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে একটি আলাদা অবস্থান নির্মাণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে তরুণ চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও নন্দনচিন্তক বিপ্লব দত্ত নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁর শিল্পসত্তা যেমন বহুমাত্রিক, তেমনি তাঁর জীবনযাত্রাও শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক সমৃদ্ধ ধারার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। চিত্রকলার সূক্ষ্ম অঙ্কন, ভাস্কর্যের দৃঢ় নির্মাণ, নন্দন ভাবনার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে তিনি এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী শিল্পী।
বিপ্লব দত্ত ১৯৭৭ সালের ১০ মার্চ পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার সোনাপদ্মা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনোরঞ্জন দত্ত ও মাতা সন্ধ্যারাণী দত্ত। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাংস্কৃতিক চর্চায় পরিপূর্ণ। পরিবারে সংগীতচর্চা ছিল নিয়মিত, ফলে ছোটবেলা থেকেই শিল্প ও সংস্কৃতির এক সজীব আবহে তাঁর বেড়ে ওঠা। এই পরিবেশই তাঁর শিল্পীসত্তাকে প্রথম দিকে প্রভাবিত করে এবং পরবর্তীতে তা তাঁর সৃজনশীল জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে। তাঁর সহধর্মিনী পুনম চাকিও একজন নজরুলসংগীতশিল্পী। তাঁদের একমাত্র পুত্র বর্ণ দত্ত ও কন্যা অংকিতা। শিল্প ও সংস্কৃতিমনস্ক একটি পরিবারে তাঁর জীবনযাত্রা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি তা তাঁর শিল্পভাবনার ক্ষেত্রেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
বিপ্লব দত্তের শিক্ষাজীবনের শুরু নিজ গ্রাম সোনাপদ্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি নাটিয়াবাড়ি ধোবাখোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। এরপর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সুন্দইল উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাশ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন ১৯৯৬ সালে মহিমাগঞ্জ কলেজ থেকে। শিক্ষাজীবনের এই সময়গুলোতেই তাঁর শিল্পীসত্তার প্রকৃত বিকাশ শুরু হয়। তিনি তখন থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করতেন এবং আশপাশের মানুষদের অবাক করে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ বা বস্তুর বাস্তবধর্মী ছবি আঁকতে পারতেন।
প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত এই দক্ষতা তাঁকে ক্রমেই চিত্রকলার দিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। ফলস্বরূপ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হন। এখানেই তাঁর শিল্পজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। অনার্স প্রথম বর্ষ থেকেই তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকেন। ২০০৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘অঙ্কন ও চিত্রায়ন’ বিভাগ থেকে তিনি বিএফএ এবং এমএফএ—উভয় পরীক্ষাতেই রেকর্ড নম্বরসহ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এই অর্জন তাঁর শিল্পজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি কেবল একজন মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না, বরং একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ডের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অধুনালুপ্ত দৈনিক মাতৃভূমি পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া সাপ্তাহিক চলতিপত্র, সাপ্তাহিক এখন এবং মৃদুভাষণ পত্রিকার প্রচ্ছদকার ও অলঙ্কারক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং বাস্তব জীবন ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীর করেছে।
বিপ্লব দত্তের শিল্পীজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ২০০৯ সালে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই ‘৫২ থেকে ৭১’-এর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ তিনি প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন্নবীর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পন্ন করেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এরপর থেকে তিনি অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন এবং এখনও এই ধারায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
যদিও বিপ্লব দত্ত একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত, তবুও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর মতে, একজন শিল্পী যদি অঙ্কন ও চিত্রায়নে দক্ষ হন, তবে তিনি শিল্পের অন্যান্য শাখাতেও সমানভাবে পারদর্শী হতে পারেন। তাঁর নিজের কাজেই এই বক্তব্যের সত্যতা প্রতিফলিত হয়েছে। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, রিলিফ ওয়ার্ক, টেরাকোটা—সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর সৃজনশীলতা ও নন্দনবোধের স্বাক্ষর রেখেছেন।
তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাঁর আঁকা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি তেলরঙের চিত্রকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), ঢাকায় তাঁর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ম্যুরাল শিল্পপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ঢাকা সেনানিবাসের ৪৬ ব্রিগেডে তাঁর নির্মিত ২৫ ফুট বাই ১০ ফুটের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রিলিফ ওয়ার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত।
ধর্মীয় স্থাপত্যেও তাঁর শিল্পীসত্তার প্রকাশ ঘটেছে। চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ উপজেলার রসুলপুরে অবস্থিত ‘সাধুরবাড়ি হরিসভা মন্দির’-এর ৪০ ফুট উচ্চতার স্থাপনা তাঁর নির্মাণশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন। রাজশাহী সেনানিবাসেও তাঁর কয়েকটি পেইন্টিং সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তেলরঙের প্রতিকৃতি তাঁর দক্ষতার আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সেনানিবাস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় তাঁর তৈরি শিল্পকর্ম ছড়িয়ে রয়েছে। সাভার সেনানিবাসে তাঁর আঁকা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের প্রবেশপথে তাঁর নির্মিত ‘অর্জন’ নামের টাওয়ারটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশিল্পের একটি চমৎকার উদাহরণ। ময়মনসিংহের নান্দাইলে নির্মিত ১০০ ফুট উচ্চতার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক টাওয়ার তাঁর ভাস্কর্যশিল্পের এক বিশাল সৃষ্টি।
পাবনার বেড়া পৌরসভায় তাঁর নির্মিত ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য ‘জ্যোতির্ময়’ স্থানীয় জনগণের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে মায়ামনি হোটেলে তাঁর তৈরি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ম্যুরাল দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংরক্ষিত ‘আত্মসমর্পণ’ নামের তেলরঙের চিত্রকর্ম তাঁর শিল্পীজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। গাজীপুরের হোতাপাড়ায় এএইচজেড প্রা. লি.-তে তাঁর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রিলিফওয়ার্ক ‘শিরোনামহীন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রংপুর সেনানিবাসের প্রধান গেটে তাঁর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘অংশুমান’ দেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনার এক শক্তিশালী প্রতীক। এছাড়া পাবনার বেড়া উপজেলার নাটিয়াবাড়ি ধোবাখোলা করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নির্মিত ‘শেকড় থেকে শিখরে’ নামের ভাস্কর্যটি শিক্ষা ও প্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এসব বড় কাজের পাশাপাশি বিপ্লব দত্ত অসংখ্য প্রতিকৃতি, ছোট বড় ম্যুরাল, রিলিফ ওয়ার্ক এবং টেরাকোটা নির্মাণ করেছেন। তাঁর শিল্পকর্মে বাস্তবধর্মী চিত্ররীতির সঙ্গে গভীর মানবিক অনুভূতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর কাজগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের শক্তিশালী প্রতিফলন ঘটেছে।
বর্তমানে তিনি অন্যান্য শিল্পকর্মের পাশাপাশি দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার প্রচ্ছদ কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। এই মাধ্যমে তিনি সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা বিষয়কে শিল্পের ভাষায় উপস্থাপন করছেন। তাঁর কার্টুনগুলো যেমন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের পরিচায়ক, তেমনি তা সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতিকে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি সংগীত ও অভিনয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। কবি আবুল হাসানের লেখা বিখ্যাত গান ‘নিঃসঙ্গ’-এর সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন বিপ্লব দত্ত। এছাড়া তাঁর দুটি মৌলিক গান—‘আজি রিমিঝিমি বরষাতে সারাদিন’ এবং ‘স্বপ্নমাঝে কাছে এসে’—আধুনিক গানের শ্রোতাদের মধ্যে সমাদৃত হয়েছে। সংগীতের মাধ্যমে তিনি তাঁর অনুভূতির আরেকটি ভিন্ন মাত্রা প্রকাশ করেছেন।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘গুক্কু’ নামের একটি টেলিভিশন নাটকে পাগল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নাট্যাঙ্গনে নিজের উপস্থিতি জানান দেন। এই অভিনয় তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার আরেকটি দিককে সামনে নিয়ে আসে।
বিপ্লব দত্ত এমন একজন শিল্পী, যিনি কেবল চিত্রশিল্পী নন; তিনি একজন বহুমাত্রিক সৃজনশীল মানুষ। তাঁর শিল্পচর্চা যেমন বিস্তৃত, তেমনি তাঁর চিন্তাভাবনাও গভীর ও মানবিক। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, সংগীত, অভিনয়—সব মিলিয়ে তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পীসত্তার প্রতীক। বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির ভুবনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শিল্পযাত্রা ভবিষ্যতেও নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হবে—এটাই প্রত্যাশা।

