বিদ্যা ও বিত্তের প্রাচুর্যে ভরা এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে মুনীর চৌধুরীর জন্ম (১৯২৫) হয়েছিল। তার পুরো নাম ছিল আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। পিতা আব্দুল হালিম চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান শাসনামলের জেলা প্রশাসক; পড়াশোনা করেছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পুত্র মুনীর চৌধুরীকেও তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছিলেন; আশা ছিল পড়াশোনা শেষ করে এই ছেলেটি বড় ডাক্তার হবে। কিন্তু না, তিনি ডাক্তার হোননি। বিজ্ঞান পড়ায় তার মন বসতো না; শিল্প—সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিকে তার মনটা কম্পাসের কাটার মতো হেলে থাকতো। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল লাইব্রেরি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। এই লাইব্রেরিতে বসেই তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জর্জ বার্নাডশ থেকে শুরু করে বিশ্বের নামিদামি লেখকের সাহিত্যকর্ম অধ্যয়ন করতেন। এমনকি উর্দু সাহিত্যও তার পাঠের বাইরে ছিল না। কিন্তু দুটি পত্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই মুনীর চৌধুরী একসময় ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আইএ পড়ার জন্য কলেজে ভর্তির চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। ইতোমধ্যে বন্ধুদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ পান। অতঃপর মুনীর চৌধুরী বড় ভাই কবীর চৌধুরীর (১৯২৩—২০১১) পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হোন। এই বিভাগ থেকেই তিনি ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন (১৯৪৭)।
২
ছাত্রজীবনে মুনীর চৌধুরী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন থেকেই তার মেধার স্ফূরণ ঘটতে থাকে। বিদ্যায়তনিক লেখাপড়াসহ সামাজিক—সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উপস্থিত বক্তৃতা, পত্রপত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ ছাপাসহ নানামুখি কর্মকাণ্ডে মুনীর চৌধুরী সুনাম ও সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় মুনীর চৌধুরী কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হোন। আবাসিক শিক্ষার্থীরা নাস্তিক আখ্যা দিয়ে সব জিনিসপত্রসহ মুনীর চৌধুরীকে হল থেকে বের করে দেয়। এমনকি এই একই অভিযোগে তার জন্মদাতা পিতা আবদুল হালিম চৌধুরীও পুত্রকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেন। তাই বলে পুত্রের প্রতি তার স্নেহের কমতি ছিল না। তিনি নিজে সরকারি চাকরি করতেন। তার নিজেরও নিজস্ব কিছু মতাদর্শ ছিল। সেই মতাদর্শের সঙ্গে হয়তোবা পুত্রের মতাদর্শ মেলেনি। তাই পিতাপুত্রের এই নিদারুণ বিচ্ছেদ। সেই বিচ্ছেদ খুব বেশি সময় দীর্ঘায়িত হয়নি। সক্রিয় রাজনীতি পরিত্যাগ করলে পিতা পুনরায় মুনীর চৌধুরীকে গ্রহণ করে নেন।
৩
কর্মজীবনের প্রথমদিকে মুনীর চৌধুরী বরিশাল বিএম কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা (১৯৫০) করেন। খুব দ্রুতই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হয়ে আসেন। এই সময়ে ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে। উদুর্কে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে ২১শে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এলে পাক সামরিক সরকার মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে ছাত্রদের হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। ঐ প্রতিবাদ সভার উদ্যোক্তা ছিলেন শহিদ মুনীর চৌধুরী। ঠিক পাঁচদিন পর জননিরাপত্তা আইনে সামরিক সরকার মুনীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। এসময় সহরাজবন্দিদের মধ্যে ছিলেন মোজাফফর আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অজিত কুমার গুহ, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবুর রহমান, রণেশ দাশগুপ্তসহ আরো অনেকে। পরের বছর ১৯৫৩ সনে রাজবন্দিরা জেলখানায় একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অপরাপর রাজবন্দির পরামর্শে রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরীকে জেলখানায় অভিনয় উপযোগী একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। রাত দশটার পর হারিকেন জ্বালিয়ে যে সব ছাত্রবন্দিরা পড়াশোনা করতো সেই সব হারিকেন দিয়েই নাটকটি মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অতঃপর মুনীর চৌধুরী হারিকেনের আলোয় অভিনয়ের উপযোগী একটি একাঙ্ক নাটক ‘কবর’ রচনা করলেন; সৃষ্টি হলো ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক অনন্য দলিল। এই নাটকে দাফন করা ব্যক্তিকেও কবরের ভেতর থেকে ওপরে উঠে আসতে দেখা যায়, দেখা যায় কথা বলতে।
৪
কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই মুনীর চৌধুরী বাংলায় এমএ পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পুলিশের নিরাপত্তায় সেদিন তিনি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। এসময় বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তখন সভাপতিকে অধ্যক্ষ বলা হতো। পরীক্ষা বোর্ডে বর্হিপরীক্ষক ছিলেন ড. এনামুল হক। এই পরীক্ষায় মুনীর চৌধুরী প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সনে মুনীর চৌধুরী বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। এবং মুনীর চৌধুরীই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি বাংলা এবং ইংরেজি দুটি বিভাগে একসঙ্গে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানসাধনাতেও তার বিপুল তৃষ্ণা ছিল। ১৯৫৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এবং ভাষা বিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই এর মৃত্যুর পর তিনি বিভাগে সভাপতির দায়িত্ব পান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই বিভাগে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই হলো মুনীর চৌধুরীর একাডেমিক জীবন ও ব্যক্তিক মতাদর্শ।
৫
ব্যক্তি ছাড়াও মুনীর চৌধুরীর একটি সাহিত্যিক জীবনও গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছাত্র জীবন থেকেই মুনীর চৌধুরী লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রথমে গল্প দিয়ে শুরু হলেও খুব দ্রুতই মুনীর চৌধুরী গবেষণায় নিজেকে মনোনিবেশ করেন। একই সঙ্গে সৃজনশীল ও মননশীল উভয় আঙ্গিনায় তিনি সক্ষমতা দেখিয়েছেন। ‘কবর’ ছাড়াও ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘দণ্ডকারণ্য’, ‘পলাশীর ব্যারাক ও অন্যান্য’ তার উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্ম। মৌলিক ছাড়াও অনুবাদকর্মেও তার দক্ষতা কম নয়। ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’, ‘রুপার কৌটা’, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ তার অন্যতম অনূদিত নাট্যকর্ম। ‘তুলনামূলক সমালোচনা’, ‘মীর মানস’, ‘বাংলা গদ্যরীতি’ তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম। লেখালেখিতে নাট্যসাহিত্যেই মুনীর চৌধুরী বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এমনকি শ্রেণিকক্ষেও তিনি শিক্ষার্থীদের দিয়ে অংশবিশেষ অভিনয় করিয়ে নিতেন।
৬
১৪ই ডিসেম্বর সকাল এগারটার দিকে মুনীর চৌধুরীর মা ভাত বেড়ে দেন। গায়ে গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি পরিধান করে মুনীর চৌধুরী ভাত খেতে বসেছিলেন। এমন সময় আল বদরের সদস্যরা এসে মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে যায়। মুনীর চৌধুরী ভাত না খেয়ে ঐ পোশাকেই বেরিয়ে যান। ঐ যে গেলেন আর ফিরে এলেন না। মুনীর চৌধুরী চাইলে আর দশজন লেখক কিংবা সাহিত্যিকের মতো তিনিও ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমাতে পারতেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মায়ায় তিনি তা করেননি। ফলে মাত্র ছিয়াচল্লিশ বছর বয়সে মুনীর চৌধুরীর ন্যায় নমস্য ব্যক্তিত্বকে আল বদরের হাতে নিদারুণভাবে প্রাণ দিতে হলো। মতাদর্শ, কর্ম ও কৃতিত্বের দিক থেকে মুনীর চৌধুরীর ন্যায় নমস্য ব্যক্তিত্ব এই বাংলায় খুব একটা আছে কি?
© ২০২৫ bongochokh.com | Developed by: Sajedul Islam
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
Copyright: Any unauthorized use or reproduction of bongochokh.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
