বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে শহীদ শরীফ ওসমান গনি বিন হাদীকে টপ ক্লাস এক্সপার্ট শার্প শুটার দিয়ে হত্যার আগে শুটারের একাউন্টে ১২৭ কোটি টাকা আসে! ২০ জনের ইউনিট ২ মাস প্রস্তুতি ও সার্ভেইল্যান্স সম্পন্ন করে। খেয়াল করে দেখেন এতো বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে এই খুন তো অন্য কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে করা যেতো? আমার হাইপোথেসিস হচ্ছে এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ হচ্ছে হাদীর অবিশ্বাস্য গতির উত্থান অথচ সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সহজ টার্গেট হিসেবে থাকা, এবং ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার বানিয়ে সেটাকে বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কার্যকরী কেন্দ্র হিসেবে এর প্রভাব বিস্তার করার এবং আরো অনেকগুলো শাখা খুলে ফেলার সমূহ সম্ভাবনা।
একটু বিশদ ব্যাখ্যা না করলে এইসব কথা আজগুবি এবং ধোঁয়াটে আলাপ বলে মনে হবে। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার ঢাকার বাংলামোটর মোড়ের অল্প কয়েকশো গজের মধ্যেই অবস্থিত। এটা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা দূরত্বে এবং এনসিপি হেড অফিসের বিপরীতে। আপনি যদি বাংলামোটর মোড় থেকে ইস্টার্ন প্লাজার দিকে হাঁটা ধরেন, তাহলে এটা হাতের বামে প্রথম গলিতেই পড়বে যেটা আপনি গলিতে না ঢুকে রাস্তা থেকেই দেখতে পারবেন। গলিতে ঢুকে তিনতলার উপরে লাল রং এ ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার লেখা। সবচাইতে ভালো হয় গুগলে যেয়ে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার লেখলে। গুগল ম্যাপে পরিস্কার ডাইরেকশন পেয়ে যাবেন। এটার ফেসবুক পেইজ নিয়মিত দেখার কারণে এখানকার সেমিনার, বইয়ের তালিকা, খোলা থাকার দিন ও সময় এরকম সবই জানা যায়। ওসমান হাদীর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে বাতিঘর আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঘোরাফেরা শেষ করে ঠিক করলাম ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারটা ঘুরে আসবো। ঐ জায়গার ভেতরে ঢুকে দেখলাম মূলতঃ একটা মাঝারি রুম, একটা বেশ বড় রুম আর একটা ছোট্ট স্টোররুম আছে। প্রথম মাঝারি সাইজের রুম হচ্ছে রিসেপশন ও সেলস সেন্টার। জুলাই আন্দোলন, দেশী রাজনীতি, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এরকম বেশকিছু বইপত্রের বড় বড় তাক আছে দেয়ালের তিনদিকে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের শ্লোগান ও ছবি দেয়া অনেক রকম পোস্টার, গেঞ্জি, স্যুভেনির। এর মধ্যে তামিল গেরিলা সংগঠন এলটিটিই এবং প্রভাকরণের ওপর লেখা আলতাফ পারভেজের বেশ মোটা আর কালারফুল একটা হার্ড বাউন্ড বই দেখলাম। তখন মনে পড়ে গেলো যে ভারত তামিল গেরিলাদের নির্মূল করার জন্য শ্রীলংকায় দুই লাখ সৈন্য পাঠিয়েছিল। সংখ্যার বিশাল পার্থক্য থাকার পরেও ভারতের সেই সেনাবাহিনীকে তামিল গেরিলারা তীব্র লড়াই করে পরাজিত করে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে না পেরে ভারত এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তামিল গেরিলাদের আত্নঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। ক্ষুদ্র সংগঠন এলটিটিই এর কাছে ভারতীয় আধিপত্যবাদের পরাজয়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়া বইটি এরকম আরো অসাধারণ কিছু বইয়ের মধ্যে জ্বলজ্বল করছিলো। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বইগুলো আমার খুবই ওয়েল সিলেকটেড মনে হয়েছে। ভেতরের বড় রুম হচ্ছে অডিটোরিয়াম এবং বসে বই পড়ার লাইব্রেরী। তবে চেয়ার টেবিল নেই। পরিস্কার কার্পেটের উপর বসার ব্যবস্থা। বই যে খুব বেশী তা না। দেয়ালের এক সাইডে একটা বিশাল বড় তাকে যত্ন করে বাছাই করা বাংলা বইপত্র রাখা ছিলো। (It is not just wide reading but very well selected reading that tends to excellence.) আরেকটা কাঠের শোকেসে ইংরেজী বই ছিলো যার মধ্যে বেশ দামী কিছু কফি টেবিল বুকস ছিলো। ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন দেশের লড়াই, র, মোসাদ, সিআইএ এগুলোর উপর বাংলা ভাষায় লেখা তথ্য ও রেফারেন্স ভিত্তিক প্রায় সব বই এখানে দেখলাম।মাসুদুল হকের লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে র এবং সিআইএ বইটা দেখলাম।
বাংলাদেশে র এর আগ্রাসনের ওপর লেখা ক্যাপ্টেন আবু রুশদের বিখ্যাত বই, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ওপর লেখা বাংলা অনুবাদ দেখলাম। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, আত্মজীবনী এসবের উপরে বেছে বেছে বেশ ভালো এবং উন্নত মানের বইপত্র রেখেছে। মেজর জলিলসহ ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী বিস্মৃত বীরদের লেখা পরম যত্নে সাজানো ছিলো। উপমহাদেশের বিভিন্ন বিপ্লবের বই দেখলাম। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সৈয়দ শামসুল হকের মতো বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকদের সমগ্র রচনাবলীও সাজানো ছিল। এই দুই রুমের মাঝখানে চা কফি কর্ণার। সিঙ্গারা, সমুচা যুক্ত করার ওনাদের ইচ্ছা ছিলো, যদিও সীমাবদ্ধতার জন্য হয়ে ওঠেনি। কফি কর্ণারের সঙ্গে জুলাই সংক্রান্ত পোস্টার ও বইপত্রের ছোট কিছু তাক। আমি যখন যাই, হাদী তখন ছিল না। রিসেপশনে টুকিটাকি কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সেইখান থেকে অনেক লম্বা আর ঝাঁকড়া চুলওয়ালা একজন তরুণকে দেখিয়ে দিলো। সেই ছেলে অত্যন্ত বিনয় এবং আদবের সঙ্গে আমার সঙ্গে কথা বললো। আমি তাকে বললাম, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ফেসবুক পেইজে একটা বড়সড় বুক লিস্ট দিয়ে বলা হয়েছিল এইসব বইপত্র সেন্টারের দরকার। পরে উৎসাহী মানুষজন তার মধ্যে অনেক বই দিয়েছিল। তবে অনেক অতি দামী এবং কিছু দুষ্প্রাপ্য বই সম্ভবত পাওয়া যায়নি। যেমন Will Durant এর অনেকগুলো ভলিউমের বিশ্ব ইতিহাস। ওগুলো কি পরে সংগ্রহ করা গেছে?
উত্তরে বললো, জি না পাওয়া যায়নি। তালিকাভুক্ত বাংলা বই সবগুলোই আছে। যেগুলো ডোনেশন পাওয়া যায়নি সেগুলো কিনে নেয়া হয়েছে। তালিকার কিছু ইংরেজি বই পাওয়া যায়নি। ওগুলো বাদ আছে। আমি ওনাদের কাছে যেসব বইপত্র পাওয়া যায়নি সেগুলোর একটা আপডেটেড লিস্টের হার্ড বা ইলেকট্রনিক কপি চাইলাম। বললো যে ইলেকশনের জন্য আমরা এই তালিকা আপাতত করিনি।
পরে আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম যে এরকম লিস্ট ভবিষ্যতে তৈরি হলে যেনো আমাকে যেনো ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে লিস্টটা দেয়া হয়। ঐখানে ঘন্টাখানেক গভীর মনোযোগ দিয়ে তাদের বইপত্র আর স্যুভেনিরের কালেকশনগুলো দেখলাম। বেশকিছু ইসলামী বইপত্র ছিলো।
সাইমুম সিরিজের বইগুলোও সেখানে ছিলো যেখানে নায়ক র এবং মোসাদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অনবরত লড়াই করে চলে। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ফেসবুক পেইজে দেখতাম যে সেন্টারের সাপ্তাহিক সেমিনারগুলো সাধারণত শুক্রবারে হয়। অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী, বাংলাদেশপন্থী স্কলার কিংবা ইসলামী চিন্তাবিদ সেখানে আসতে দেখতাম যাদের মূলধারার অনেক মিডিয়ায় উপেক্ষা করা হয়। গত ষোলো বছর ধরে মিডিয়ায় শুধুমাত্র স্তাবকদের প্রাধান্য দিয়ে ডাকাডাকি করা হতো। ওসমান হাদী সেই স্তাবক এবং বিশেষ কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সংকীর্ণ এলিটতন্ত্র ভাঙ্গার একটা চেষ্টা করছিলো। সমস্যা হচ্ছে, এসব জিনিস অতি দ্রুত সম্প্রসারণ করা এবং বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে ভবিষ্যতে তার পক্ষে বিপজ্জনক একজন ব্যক্তিতে রুপান্তরিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই।
Alfred Hitchcock এর একটা সিনেমা আছে। “The Man Who Knew Too Much” ইউটিউবে হিচককের সব সিনেমাই পাওয়া যায়। যদিও সেগুলোর অধিকাংশই সাদাকালো তারপরেও থ্রিলার ছবির জগতে সেগুলো এখনো মাস্টারপিস। এই সিনেমার নায়ক একজন অত্যন্ত হাসিখুশি দিলখোলা মানুষ।
তবে দুর্ঘটনাবশত এমন সব জিনিস সে জেনে ফেলে যেজন্য তাকে বিপজ্জনক এবং গোপন তথ্য জানা মানুষ হিসেবে টার্গেট করে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সেইসব ডিস্টোপিয়ান সায়েন্স ফিকশন হয়ত অনেকেই পড়েছেন যেখানে অতিমাত্রায় যোগ্য এবং বুদ্ধিমান মানুষদের সাম্রাজ্যের আধিপত্যবাদের জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে নির্মূল করে ফেলা হয়। আমাদের দেশের অনেক নির্বোধ ব্যক্তি হাদীর জীবদ্দশায় তাকে তাচ্ছিল্য এবং উপহাসের সঙ্গে দেখেছে। হয়তো তাকে গোণায় ধরার দরকারই মনে করেনি। তাকে এবং তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মাত্রাকে দেশের সাধারণ মানুষ অনুভব করতে পেরেছিলো। এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও সম্ভবত, দেশের গণশত্রু ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও গত দেড় বছরে তার উত্থানের গতি ও মাত্রা লক্ষ্য করে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতে তার অবিশ্বাস্য রকম উঁচু পর্যায়ে উত্থানের সম্ভাবনা টের পেয়েছিলো, যেকারণে এতোসব গুরুত্বপূর্ণ লোক থাকতেও তাকে নিজেদের জন্য বিপজ্জনক মনে করে এতো অদ্ভুত বিশাল আয়োজন করে সরিয়ে দেয়া হয়। কারণ সে শুধু নিজে আধিপত্যবাদী ভারতের জন্য বিপজ্জনক ছিলোনা, বরং অন্যদের মধ্যেও সেই আজাদীর আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনা ও জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া শুরু করেছিলো। তার সেই বিপ্লবী স্পিরিট ছিলো মারাত্মক সংক্রামক। এটাই ছিলো সমস্যা। সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা এই সেন্টার কিছুদিনের মধ্যেই খুলবে বলে জানানো হয়েছে। তবে, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। এটা শুধু টাকা পয়সার বিষয় না। এর চাইতে বড় বড় লাইব্রেরী বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অনেক আছে, যেগুলো জিন্দা লাশের মতো পড়ে থাকে। ভবিষ্যতে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ডোনেশন বা বইয়ের বা দালান কোঠার অভাব হবেনা, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, জীবিত মানুষের আত্না যখন চলে যায়, তার ওজন বা শরীরের আকৃতি একই থাকে, তবে শরীরে তখন আর সেই মানুষটা থাকেননা। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বইপত্র দালান সবই থাকবে, শুধু স্পিরিটটা খুব সম্ভবত সেভাবে আর থাকবেনা। হাদীর খুনি যেহেতু ঐ সেন্টারে হাদীর পাশেই বসেছিল, সেহেতু আগন্তুক ও অতিথি দেখলেই তাদের ট্রমার কারণে নতুন সবাইকে সম্ভাব্য খুনি মনে হবে। সেখানকার বাতাসে মিশে থাকবে সন্দেহ, শোক আর ভয়ের অসহনীয় স্মৃতি। এটির স্থান পরিবর্তন করা এসব অদৃশ্য সাইকোলজিক্যাল ট্রমা কাটানোর জন্যই দরকার। জাতীয় বক্তৃতা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একাধিকবার বিজয়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র, ইউনিভার্সিটি অফ স্কলারস এবং সাইফুরস কোচিং এর অতি জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক, ক্যারিশমাটিক, ভিশনারি ও মুগ্ধ করার মতো বক্তা ওসমান হাদী যেভাবে ধুমকেতুর গতিতে এই ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে কয়েক মাসের মধ্যেই আপ্রাণ চেষ্টায় সৃষ্টি করে তার নিজের মতোই অসম্ভব প্রাণবন্ত ও উদ্দীপনাময় করে তুলেছিলো, এই সেন্টারের শুধুমাত্র দৈহিক নয় বরং এর সেই প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিপ্লবী স্পিরিটের ধারাবাহিকতা দেখার জন্য ক্ষীণ হলেও জ্বলন্ত আশায় বুক বেঁধে থাকলাম।
