ওসমান হাদীকে নিয়ে কিছু লেখার জন্য আমার ইনবক্সে অনেকে অনুরোধ করেছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যেও বলেছেন। হয়তো কিছু মানুষ লেখার মধ্যে সহমর্মিতা খুঁজে থাকতে পারেন। হাদীর মৃত্যুতে দেশের মানুষ এতটাই শোকাহত যে সংহতি ও সমব্যথী হওয়া একান্ত জরুরি। কিন্তু শোকজ্ঞাপন ও দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি ছাড়া কীই বা লেখা সম্ভব!
কারণ হাদী ছিলেন একজন তরুণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা, আর আমি নিছক একজন কবি-সাহিত্যিক। আমাদের পরস্পর কোনো পরিচয়ও ছিলো না। তবু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এক ধরনের নতুন সাংস্কৃতিক বয়ানের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই বিকল্প বয়ান স্তব্ধ করার একটি প্রয়াসও স্পষ্ট।
জুলাই বিপ্লবের পরে হাদী সেই সব কণ্ঠস্বরের অন্যতম- যারা স্বীকার করেন, জুলাই আন্দোলন কোনো বিশেষ দল মতের ছিল না। অনেক আওয়ামী পরিবারের সন্তানেরাও এই আন্দোলনে শরিক ছিলনে। রাজনৈতিক যে মিথষ্ক্রিয়ার অভাব এদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে বিরাজ করছে- হাদী তার অবসান চাইতেন। এসব কথা আমি বলছি, কেবল তাঁর কিছু মৌখিক ভাষ্যের ওপর নির্ভর করে। কারণ এরচেয়ে বেশি আমার জানা নেই।
হাদীকে নিয়ে আমি যে একেবারে কিছু লিখিনি—তা নয়। আততায়ীর গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হওয়ার পর এক লেখায় আমি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করার পাশাপাশি একটি প্রশ্ন তুলেছিলাম। হাদী যাদের নিয়ে কথা বলতেন, যাদের স্বার্থে আঘাত লাগত, যাদের কায়েমি সুবিধা ব্যাহত হতো—তাদের তো অভাব ছিল না। আর তাঁর শত্রু সংখ্যাও বিচিত্র পক্ষের। সে ক্ষেত্রে তাঁর চলাচলে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল কি না—এই প্রশ্ন তোলা কি অনুচিত ছিল?
সেই লেখায় আমি তাঁকে আধুনিক ডন কিহোতের সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। ডন কিহোতে একটি আদর্শে বিশ্বাস করে লড়াই করেন, কিন্তু সময়টি হয়তো তাঁর অনুকূলে নয়। তিনি বায়ুকলকে দৈত্য মনে করে, টিনের তলোয়ার হাতে মরকুটে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধে নামেন।
এই তুলনা হাদীর সততা, সাহস বা নৈতিক অবস্থানকে খাটো করে না। বরং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিপক্ষের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে একাকী আদর্শবাদীর সংঘাত বোঝানোর চেষ্টা ছিল। তবু সেই লেখা দেখে কানাডা থেকে আমার এক লেখক বন্ধু ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন লেখাটি সরিয়ে ফেলতে—ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কায়। আমাদের সমাজে প্রতিক্রিয়ার ধরন যেভাবে ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, তাতে এই আশঙ্কা অমূলক নয়।
হাদীর মৃত্যুর খবরে অসংখ্য মানুষের মতো আমিও শোকাহত ও বিচলিত। তাঁর অনুপস্থিতি অনেক উপস্থিতির মধ্যেই টের পাওয়া যায়। হাদী এমন একটি অংশের কণ্ঠস্বর ছিলেন রাষ্ট্রের সঙ্গে যাদের বোঝাপড়া এখনো অসম্পূর্ণ।
গত রাতে কয়েকটি কবিতা লিখেছি। সেগুলো হয়তো হাদীকে নিয়ে নয়। আর কবিতার ভাষা তো স্বভাবতই রূপক ও ইঙ্গিতবহ। অথচ শোকের মুহূর্তে মানুষ আরও সরাসরি, বোধগম্য ভাষা খোঁজে—অন্যরাও কি তার মতোই অনুভব করছে, তা জানতে চায়।
যদিও কবি-সাহিত্যিকদের সমাজের মুখপাত্র ভাবা, কিংবা তাদের কাছ থেকে নিজস্ব কণ্ঠের প্রতিধ্বনি প্রত্যাশা করা এক ধরনের অন্যায় দাবি। তবু ইতিহাসে কবিরাই বহুবার এই প্রতিধ্বনি বহন করেছেন। আমাদের কালে এসে সেই প্রতিধ্বনির পথ প্রায় দু’টিতে সীমিত—সরকারের পক্ষে অথবা সরকারের বিরুদ্ধে।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমি লক্ষ্য করছি, কোনো সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিলেই একজন লেখকের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় না। স্বৈরতন্ত্র, খুন, গুম, ভোটহীন রাজনীতির বিরোধিতা করলে তা সব সরকারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সবাই যদি ক্ষমতার পক্ষে স্বেচ্ছায় গমন করে, কিংবা কারও হয়ে কথা বলে, তাহলে অন্য অন্য কোনো কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে পার্থক্য থাকলো কোথায়!
জুলাই-আগস্টের আগ পর্যন্ত তাঁকে সেভাবে না চিনলেও সাম্প্রতিক সময়ে যাদের কথা শুনেছি, তাদের মধ্যে হাদীকে ব্যতিক্রমীভাবে প্রতিভাবান, যুক্তিবাদী, সাহসী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন মনে হয়েছে । তাঁর কথায় ছিল সততা, সাহস এবং প্রাণের এক ধরনের দীপ্তি। যদিও কখনো তাঁর স্ল্যাং সংহতির ভাষা হলেও আমার অভ্যস্ততার বিপরীত। তাছাড়া অবশ্যই তাঁর বয়ান অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ বা এড়িয়ে যাওয়া রাজনৈতিক কৌশলের অংশ । তবু ওসমান হাদী যখন তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা ভেবে বলতেন, তখন তাঁর কণ্ঠ কেমন যেম নরম ভেজা ও আবেগপূর্ণ হয়ে উঠতো। মনে হতে সত্যি যেন তিনি মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছেন বা কামনা করছেন। আর এতে তাঁর সকল প্রকাশ হৃদয় থেকে উত্থিত বলে মনে হতো।
তৃণমূল থেকে উঠে আসা যে ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, এবং যাকে অভিজাত ও কায়েমি শক্তি প্রায়শই দমন করে—হাদীকে অনেক সময় সেই প্রতিনিধিত্বের কাছাকাছি মনে হয়েছে। তাহলে কেন তাঁকে ডন কিহোতের সঙ্গে তুলনা করেছিলাম?
কারণ তিনি যে স্বপ্নে বিশ্বাস করতেন, যে রাজনৈতিক নাইট হিসেবে লড়াই করতে চাইতেন—সেই রাজা বা রানিরা তাঁকে আদৌ স্বীকৃতি দিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট ছিল না। এমনকি তাঁর নিজের দল বা বলয়েও সংগঠিত শক্তির উপস্থিতি খুব দৃশ্যমান ছিল না।
যদি তা থাকত, তবে তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারের দপ্তর আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটত না। ডেইলি নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবিরের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটত না। অথচ হাদী এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাতের বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন—বিকল্প ও সমান্তরাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই নতুন সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রয়োজন।
হাদী কোনো দল নিষিদ্ধ করার চেয়ে অপরাধীদের বিচারের দাবিকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন।
এদেশে লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। মানুষের অস্তিত্বের লড়াইই সবচেয়ে মৌলিক। রাজনৈতিকভাবে এই ভূখণ্ডে গণমানুষের সংগ্রামের সূচনা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—এই প্রতিটি সময় আমাদের মত ও পথকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। তবে একাত্তর একটি রাষ্ট্রের জন্মের দাগ।
কিন্তু যে ১৯৭১ দেখেনি, যে ৫২-তে ছিল না, যে ৯০-তে শিশু ছিল—তার পক্ষে পূর্বের সব যুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়, এবং তার জন্য তাকে দায়ীও করা যায় না। আমার জীবন ও আমার সন্তানের জীবন এক নয়; তাদের সংগ্রাম তাদের নিজেদের করেই করতে হবে।
প্রবীণ হিসেবে তাদের পথ রুদ্ধ করা যায় না। তবে অভিজ্ঞতা যদি নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হয়, ভবিষ্যৎ হয়তো আরও ভালো হতে পারে।
রাষ্ট্র কেবল যুক্তিতে চলে না—চলে ক্ষমতা, অস্ত্র ও হিসাবের সমীকরণে। এই বাস্তবতার ভেতরেই হাদীর মতো কণ্ঠগুলো সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই তাঁর মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত করে।
সরকার যখন আছে, সরকার যখন কাজ করছে, তখন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। হাদীর হত্যার জন্য সরকারকে চাপ দিতে হবে—যাতে দ্রুত তদন্ত হয়, হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা যায় এবং বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান ও সময়সীমাবদ্ধ হয়। কোনো পত্রিকা বিচার করতে পারে না, আর অভিযোগ ছাড়া কাউকে দায়ী করাও অনুচিত। একই দিনে দীপু দাসের খুনের কারণ তদন্ত ও দ্রুত বিচার করতে হবে।
মতভিন্নতা থাকলেও মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত হলে ফ্যাসিবাদ আরও সহজ হয়।
হাদী বলতেন—মৃত্যুর ফয়সালা আল্লাহর আসমানে হয়। একই দিনে এক রাজনৈতিক নেত্রী ও এক সাংবাদিকের মৃত্যুর খবর এসেছে। ফয়সালা হয়তো আসমানে, কিন্তু জমিনে যারা শাসন করে—তাদের দায় তাতে কমে না।
হাদীর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর সংগ্রামশীল জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা রইল। যে শিশু পুত্রের ভবিষ্যতের জন্য তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়া বাকিদের দায়।
একই সঙ্গে এই শোক যেন আমাদের যুক্তি, সংযম ও ন্যায়বোধ হারিয়ে ফেলতে না বাধ্য করে। হাদীর মৃত্যু আমাদের শোক শেখাক—কিন্তু অন্ধ প্রতিশোধ নয়। শেখাক যুক্তি, ন্যায় এবং সাহসী সংযম।
মজিদ মাহমুদ, কবি ও গবেষক
