অবিনাশ দাসেরই ডোম হিসাবে শুধু নিয়োগ রয়েছে। সরকারি হাসপিতালের ডোম সে। বেতন মাসিক কুড়ি টাকা। এই টাকা ট্রেজারি অফিস থেকে তোলার নিয়ম। সরকারি কর্মচারিরা মাস শেষে বেতন ভাতাদি তোলেন। তার তোলা হয় না। মাসের পর মাস সরকারি খাতায় তার টাকা জমা হয়। জমা হয় বছরের পর বছর। জেলা অফিসের লোকজন অবিনাশ দাসের বেতন বিল করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। কুড়ি টাকার চেক করা বেশ ঝামেলার। অবিনাশ দাসের বাবা ছিলেন সুনীল দাস। তিনিও পুরো জীবন এই পদে মাসিক দশ টাকা বেতনে চাকুরী করে গেছেন। তার টাকাও তোলা হয়নি। রাষ্ট্রের কোষাগারে কত সব লাওয়ারিশ টাকার মিল ও গড়মিল হিসাবে ঐ টাকাগুলোর খোঁজ কারোর জানা থাকে না। অবিনাশ অবশ্য বাবার মৃত্যুর পরে কিছুদিন অফিসে ঘোড়াঘুরি করে দেখেছে। বাবার নামে জমে থাকা টাকা গুলো তোলার জন্য। সরকারি অফিস থেকে টাকা তোলা সহজ কাজ নয়। প্রচুর ঝামেলার কাজ। মুখের কথায়তো আর টাকা দেবে না। এ জন্য কাগজপত্র চাই। দনিয়ার কাগজপত্র। তারপর এটেবিল ওটেবিলে দৌড়াদৌড়ির ব্যপার আছে। তাবৎ জীবনের বকেয়া বেতন তুলতে অফিসের কয়েকজন গম্ভীর মুখে বকশিশ দাবি করে বসে। অবিনাশ বাংলা মালের গন্ধ ছড়িয়ে উপরের পাটির দাঁত বের করে বলে, ছার, বাপের বেতনই ছিলো মাত্তর দশ ট্যাহা, বকশিশ কত দিবো? অবিনাশের মুখের অনিয়ন্ত্রিত বেয়ারা ধরনের থু থু ও মদের কটু গন্ধ তাদের নাকে থাপ্পর মারে। তারা মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। কপাল ঘুচিয়ে বিকৃত স্বরে বলে, রাবিশ! একজন ডোমের সাথে সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের আচরণ কতটা আপত্তিকর বা অসমমান জনক তা এই সময়ের সমাজ ব্যবস্থার শিক্ষিত মানুষেরাও আন্দাজ করতে পারবেন না। অবশ্য অবিনাশ এতে ব্যথিত হয়নি। শিক্ষিত শ্রেণির লোকজনের আচরণের কারণে তার মন ব্যথিত হয় না। এরা হলেন দেবতা। দেবতাদের দোষ নেই। কয়েকদিন এ টেবিল ও টেবিল ঘোড়াঘুরি করে সময় আর শ্রম অপচয় হচ্ছে এই বিবেচনায় বেতনের টাকাটা তুলতে যায়নি। অবিনাশের ঠাকুরাদা কালিপদ দাশ ডোম ছিলেন। সাতচলি¬শের দেশ ভাগের সময় ঐ পদে তার বেতন ছিলো পাঁচ টাকা। বাবার মুখে শুনেছে সেও বেতন তুলতে পারেনি।
তাদের সংসার চলে মানুষের লাশ পেলে। অপমৃত্যুর লাশ। বেওয়ারিশ লাশ। হাসপিতালে যে লাশ নিয়ে আসা হয় সেই লাশ থেকে। মর্গে সেই লাশ এরা তুলে আনে। ধাঁরালো ছুরি দিয়ে কাঁটে। তারপর সেলাই করে লাশটিকে ভালো করে প্যাকেট করে তুলে দেয় আত্মীয় স্বজনদের কাছে। আত্মীয় স্বজনেরা বকশিশ দেয়। বকশিশের টাকায় চলে সংসার।
মেডিক্যাল কলেজের এই মর্গটিতে কত রকম মানুষ লাশ হয়ে আসে। ধর্ম কর্মের বিচার কি আর লাশের শরীরে লেখা থাকে? লাশ বড় কঠিন জিনিস। মানুষ আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের লাশ একই রকম। লাশের উপরের পোশাক দেখে বোঝা যায় মানুষটি ধনী না গরিব শ্রেণীর। তবে লাশটির শরীর থেকে যখন কাপড় চোপর খুলে নেয়া হয় তখন কিছুই বোঝা যায় না।
গরীব শ্রেণীর লাশের আত্মীয় স্বজনও হয় গরিব শ্রেণীর। গরিব মানুষের টাকা নেই কিন্তু ক্রন্দণ থাকে প্রবল। এরা লাশ নেয়ার সময় বকশিশের কথা শুনে হতাশ মুখে তাকায়। একজন মাতাল মরা মানুষটাকে কাঁটাছেড়া করে বকশিশ চাচ্ছে। মানুষটার কী হালটাই না করেছে। আহা! মরা মানুষের শরীরটাকে নিয়ে এসব করে কী লাভ? স্বজনেরা আহত চোখে কাঁদতে থাকে। ভ্যানে লাশটাকে তুলে অবিনাশ দাসকে বলে, টাকা নাই। টাকা পামু কই! অবিনাশ অসহায় সর্বশ্ব হারানো এই সব বঞ্চিত শোকাহত স্বজন শ্রেনীর মানুষের ব্যথা অনুভব করে দ্বিতীয়বার আর উচ্চারণ করে না বকশিশের টাকা! পুরো শ্রমটাই মাটি হয়ে যায়।
ধনী শ্রেণীর লাশ থেকেও যে ভালো বকশিশ আসে, তাও না। ধনী ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনেরা মর্গ থেকে লাশ গাড়িতে তুলেই রওনা দেয়ার ব্যস্ততা দেখায়। অবিনাশ তখন লাশ আটকিয়ে দেয়। বলে, বকশিশ দ্যান, লাশ ন্যান।
কেউ কেউ দেয়। কেউ কেউ দেয় না। ধমক দেয়। প্রভাবশালী হলে শাশিয়ে দেয়। নেতা ধরনের হলে বলে, ব্যাটা তোর চাকুরী খাচ্ছি দারা। লাশ নিয়ে ঘুষ!
অবিনাশ বলে, ছার, আমরা হল্যাম ডোম। বিশ টাহা বেতনের চারহি করতিছি। আমাগরে বউ পুলাপান আচে। আপনাগরের বকশিশ যা পাই…
কেউ কি বিশ্বাস করবে? স্বাধীনতার আগে যখন দেশ পাকিস্তানীদের খপ্পড়ে ছিলো তখনও তার বাবা সুনীল ‘বকশিশ’ নিয়েই সংসার চালিয়েছে। স্বাধীনতার পর অবিনাশের ঘাড়ে সেই দায়িত্ব। তাকেও বকশিশের উপর সংসার চালাতে হয়! সরকারি চাকুরী বিধিতে ডোম পদে কোনো নিয়োগ দেয়ার নিয়ম নেই। সুইপার পর্যন্ত নিয়োগ হয়। অথচ ডোম ছাড়া মর্গ অচল। ডোমের কাজ কি ডাক্তার নার্স করতে পারে?
রাজশাহী অঞ্চলের ভাটা পাড়ায় অবিনাশ দাসের বাড়ি। এই অঞ্চলের বস্তির মতো কয়েক ঘর ঠাসাঠাসি করে মিলেমিশে ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে। মিউনিসিপালের ময়লা আবর্জনা ওদিকটায় স্তুপ করে ফেলা হয় বলে সভ্য সমাজের মানুষের প্রয়োজন পরেনা ওদিকটাতে যাওয়ার। এমনকি যারা প্রত্যুষে রোগমুক্তি লাভের আশায় হাঁটাহাটিতে বের হয়, তারাও সেদিকটায় মুখ ঘোড়ান না। শহরের পাকা ড্রেন অবশ্য সেইদিকে চলে গেছে। ড্রেনের পাটাতনই ওখানে যাওয়ার প্রধান রাস্তা। পাকা ড্রেনটা অবিনাশদের বাড়ি ঘরের সামনে এসে দরদর করে বর্জ্য পানির বমি করে। বর্জ্য পানি যাবতীয় দুর্গন্ধ রোগ-জীবানু সঙ্গে করে অবিনাশদের ঐ ঘরবাড়ির আশপাশ দিয়ে স্বেচ্ছাচারির মতো উঁকিঝুকি দিয়ে বড় নর্দমায় আত্মহতি দেয়।
সেই পাকিস্থান পিরিয়ডের কথা। অবিনাশের ঠাকুরদা তারাপদ দাস যখন ঘর তুলে ছিলেন তখন এ দিকটায় দিনের বেলায় শিয়াল দেখা যেত। শুনেছে অবিনাশ, ওদিকে যে ঝোরঝোপ ছিলো তাতে বাঘ ছিলো। সেইতো নিজের চোখে মেছে বাঘ দেখেছে। সেই সব ঝোরঝোপ এখন আর নেই। নগরের শরীর যেভাবে ফুলে ফুপে উঠছে ঠিক সে ভাবেই আশেপাশের ঝোরঝোপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এখন আর শিয়াল বাঘ চোখ পরে না। এখন ওদিকে বড় বড় সাইনবোর্ড যেন ভূমি ফুঁেড় রাতারাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞাপন। ইটের প্রাচীর। মেথর পাড়ার লোকজন কি আর পড়ালেখা জানে? রং চং সাইনবোর্ড গুলোর দিকে তাকিয়ে কতরকম ভাবনাই না এরা করে যায়। দীর্ঘশ্বাস পরে। অবিনাশরা আর কতদিনই বা থাকতে পারবে কে জানে।যদিও মেথর পল¬ীর জমি সরকারের। সরকারি খাস জমিও কি নিরাপদ? দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার বাহাদুর রয়েছে। তারা এসব খাস জমি ফেলে রাখবে কেন? উন্নয়নের ধারায় মেথর পল¬ীটা কোনো এক সকালে দেখা যাবে নতুন মাটির স্তুপের নিচে পরে আছে! তবুও ভালো, এখন পর্যন্ত টিকে আছে। বেঁচে আছে। শহরের ময়লা আর্বজনা যারা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, সেই ডোম আর মেথররাই ময়লা আবর্জনার ¯তুপের পাশে ঠাসাঠাসি করে বেঁচে আছে।
এই পল¬ীর সুঠামদেহী মহুয়া দাসকে বিয়ে করেছে অবিনাশ দাস ! মহুয়া দাস মেথরনী। মিউনিসিপ্যালের রাস্তায় ঝাড়ু দেয়। ভোর থেকে লেগে যায় । সে একা নয়। এই পল¬ীর অনেকেই আছে। এ পেশায় মিউনিসিপালের ভালো বেতন। বাড়তি কিছু আসে। রাস্তার পাশের দোকানগুলো থেকে বকশিশ আসে। পূজা পাল্বনে কেউ না করে না। কাকডাকা ভোরে রাস্তা ঝাট দিতে মহুয়ার খারাপ লাগে না। তখন শহরটাকে অন্য রকম লাগে। পবিত্র পবিত্র। নটা দশটার মধ্যে তার কাজ শেষ হয়ে যায়। এরপর বাড়ি আসে সে। ঘরে তার বিস্তর কাজ পরে থাকে। অবিনাশ মহুয়া দাসের কোলে তিন বছরের মাথায় দুইটি কন্যা সন্তান দিয়ে নিশ্চিন্তে আছে। কন্যাদেরকে মহুয়া তার বৃদ্ধ শ্বাশুড়ির জিম্মায় রেখে যায়। শ্বশুড়ি ভোর থেকে বিরবির করে অনর্গল দেব দেবীর আরাধনা গুন-কীর্তন ও নিজের জীবনের প্রতি বিষাদ কটু বাক্যবর্ষণ করে আর কন্যাগুলো মেথর পলি¬তে গলা ফাঁটিয়ে কান্না করে। মহুয়া ঘরে ফিরেও সব কিছু সামলে নিতে পারে না। সেও বৃদ্ধ শ্বাশুড়ির মতো সারাদিন বিরবির করে বকে যায়। অবিনাশ সারাদিন বাড়ি ফেরে না। হাসপিতালের মর্গের পাশে তার আস্তানা। দুপুরে বাইরে খায়। পাউরুটি কলা দিয়ে চালিয়ে নেয়। হাসপিতালে কখন লাশ আসে ঠিক নাই। লাশ এলেই খোঁজ পরে অবিনাশের। হৈ চৈ শুরু হয়। এই ডোম কোথায়, ডোম…।
এই অবিনাশ, অবিনাশ…।
অবিনাশ লাশ’টা নিয়ে তোলে মর্গে। লাশ কাটতে হয়। দেহের ভেতরের প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রতঙ্গ সুন্দর করে কেটে কাঁচের বোয়ামে ফরমালিনের ভেতর ডুবিয়ে রাখে। ডাক্তাররা পাশে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেন। বলেন, অবিনাশ,এটা নাও-ঐ যে ঐ টা…।
লাশ কাঁটতে গিয়ে অবিনাশ বড় আনন্দ পায়। কী সুন্দর শরীর। শরীরের ভেতরটা আরো বেশি সুন্দর। থরে থরে সাজানো অঙ্গ গুলো। কোনো টা ফুলের মতো। কোনোটা ফলের মতো। কোনোটা ফুটবল কোনোটা চকলেটের মতো!
কাটাকাটি হয়ে গেলে মৃত দেহটাকে সুন্দর করে সেলাই করতে হয়। সেলাই করা লাশটিকে ভালো করে প্যাকেট করা দরকার। মার্কিন কাপড়ে মুড়িয়ে লাশটিকে এমন সুন্দর করে স্বজনদের হাতে তুলে দিতে হয যেন কেউ বুঝতে না পারে। লাশের দেহ বলেতো আর হেলাফেলা করা যায় না! অবিনাশ সুন্দর সেলাই দেয়। লাশ কাটাও একটা শিল্প। এই শিল্পকাজ কয়জনে জানে? অবিনাশ বাপদাদার হাত ধরে শিখেছে। এটা কম কথা নয়। সে চমৎকার কাজ জানে। কেউ বুঝতে পারে না কী হয়ে গেছে মানুষটার শরীরের ভেতর।
অবিনাশের খারাপ লাগে তখন যখন লাশ তুলে দিয়ে শোকাহত আত্মীয় স্বজনদের কাছে হাত পাততে হয়। লাশ বুঝিয়ে দেয়ার সময় শক্ত মুখে বলতে হয়, বকশিশ…বকশিশ দ্যান। বকশিশ মেলে কম বেশি। বকশিশেই সংসার চলছে। যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় এই পেশায় আছে অবিনাশরা। এদের সংসার তো থেমে নেই?
অবিনাশ গভীর রাতে বাড়ি ফেরে। ফেরার সময় গলির মাথায় চায়ের দোকানে বসে দুই আউন্স গিলে আসে। দুই আউন্সে তার নেশা হয় না। শরীর চাঙ্গা হয়। তারপর পাকা ড্রেনের বড় বড় পাটের উপর থপ থপ করে পা ফেলে ঘরে ফেরে।
মহুয়া হারিকেনের আলোর তেজ বাড়িয়ে দেয়। বলে, রাত করল্যা ক্যান গো? অবিনাশ রাত করতে চায় না। তবুও করতে হয়। হাজার হোক চাকুরী। লাশ এলে তো আর চলে আসা যায় না। মুখে বলে, বউ লাশ ছিলো যে…
অবিনাশের কলিজার ভেতর ঠকঠক শব্দ হয়। দুই আউন্সের কেরামতির কারণে বুঝতে পারে সে মিথ্যা বলছে। সব দিনতো আর লাশ থাকে না। ইচ্ছে করলেই একটু সকাল সকাল ফিরতে পারে অবিনাশ। তা ছাড়া লাশ এলে মোবাইলে খবর দেয়ার উপায় আছে। বিশ টাকা বেতনের চাকুরিতে এতো কী নিয়ম? ডাক্তাররাই তো তাকে কেয়ার করে। না করে কী উপায় আছে? ডোমের কাজ কী সবাই পারে? পারে না। তারপরও অবিনাশ ঐ মগের্র পাশে দিনরাত মদ খেয়ে পরে থাকে। আসলে তার ঘর ভালো লাগে না। মহুয়াকে ভালো লাগে না। বাচ্চা কাচ্চার কান্নাকাটি ভালো লাগে না। তার মন কাঁদে ছয় বছর আগের চন্দনার জন্য। মেথর পল¬ীর সামনের বস্তির মেয়ে চন্দনা। চন্দনার রূপ ছিলো মেমদের মতো।
চন্দনা যে বস্তির মেয়ে তা কে বলবে? প্রতিদিন গোছল করে। গায়ে সুগন্ধি মাখে। চোখে কাজল দেয়। ঠোঁটে লাল রং মেখে থাকে। অবিনাশ তাকে ভালোবেসে ছিলো। চন্দনাকে বলেছিলো, বিহা করবি?
চন্দনা হাসি দিয়ে বলেছিলো, তুই ডোম, তোর শরীলে মরা গন্ধ! ঐ গন্ধ আমার বমি আসে যে…। অবিনাশ বলেছিলো, বাপ দাদার কাজ শিখেচি। আর কুনো বিদ্যা নাই যে-।
চন্দনা হাসতো। রহস্য জনক হাসি। মেমদের মতো। তার হাসির ভেতর অনেক কথা। অনেক রকম অর্থ। অবিনাশ পাগলের মতো বারবার বলত, আমারে বিহা কর না চন্দনা! চন্দনা খিলখিল শব্দে হেসে বাতাসের সুগন্ধি অবিনাশের নাকের সামনে ঢেলে হারিয়ে যেত। না করতো না। প্রায় প্রতিদিন অবিনাশের পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। অবিনাশ ঐ পথ দিয়েই তো শহরে যায়। চন্দনার পায়ে রূপার মতো শাদা নুপুর দিয়ে ঝনঝন আওয়াজ তুলে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে দৌড়াতো অবিনাশ মুগ্ধ হয়ে দেখতো। অবিনাশ পাগলের মতো ভালোবেসেছিলো। বলেছিলো, তুই বিয়া না করিস-আমারে একবার ভালোবাসা দে…।
চন্দনা ফিক করে হাসি দিয়ে বলতো, কী চাস তুই?
‘তোর দেহ। দেহখান একবার দে…।’
চন্দনা হেসে বলত! আমার দেহে কী আছে রে…।
‘আছে, আছে। চাঁদ আছে, রূপা আছে, সুগন্ধি আছে- যাদু আছে, মায়া আছে।’
‘এই দেহ নিয়া তুই কী করবি?’
‘একটু ধরবরে! বালো কর্যা ছুঁয়ে দেখব! মন লাগায়্যা দেখব! কী সুন্দর!’
অবিনাশ কত ভাবে বলতো ঠিক নাই।
চন্দনা হাসতে হাসতে লুকিয়ে পড়ত এদিক ওদিক। চন্দনার শরীরের গন্ধটা বড় বড় নিশ্বাসে টেনে নিত অবিনাশ। ভারি পায়ে হেঁটে যেত শহরের দিকে। পাকা রাস্তায় ওঠে বারবার ফিরে তাকাতো বস্তির দিকে। ভাটাপাড়ার দিকে। আহা! চন্দনা কী সুন্দর।
সে সময় অবিনাশের বাবা সুশীল একা একা পারতো না লাশটাকে পুলিশ ভ্যান থেকে তুলে আনতে। মানুষ লাশ হলে ভীষণ ভারি হয়ে যায়। পাথরের মতো ভারি। বৃদ্ধ সুশীল একা কী ভাবে লাশ তুলে নেবে? অবিনাশকে সাথে নিতো। অবিনাশ বাবার পাশে দারিয়ে তার হাতে লাশ কাঁটা দেখত। চকচকে ছুরি দিয়ে দেহটাকে ফালি ফালি করে যখন কলিজাগুলো বের করে আনতো অবিনাশ কাঁচের বয়েমে এগিয়ে ধরতো। সুশীল ফিসফিস করে বলত, সাবধান! সাবধানরে বাপ! অবিনাশ আশ্বর্যন্বিত হয়ে বলতো, বাবা, লাশের আবার সাবধান কী?
সুনীল হাসতো। বলতো,লাশেরই বেলায় বেশী সাবধান হতে হায় রে বাপ, লাশ সব দ্যাখে। মানুষই আন্ধা! দেখব্যার পায় না।
অবিনাশ চন্দনাকে পায়নি। চন্দনার বিয়ে হয় চায়ের দোকানদার কানুদাসের সাথে। গলির মাথায় কানুদাসের দোকান। ঐ দোকানে প্রতিদিন অবিনাশ চা খায়। তারপর দুই আউন্স গেলে। কানুদাস স্বরপরা দুধের চা বানায় ভালো। চায়ের কাপে চামচের ঝড় তুলে আনন্দিত গলায় বলে, জানিস অবিনাশ, এই স্বরগুলোন দিয়া ঘী বানাই! ঘী দিয়া আমার বউ ভাত খায়। ঘী হলে ওর আর কিছু লাগে না!
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে ভেঙে পড়ে অবিনাশের বুকের পাজঁরের কোথাও। তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকায় কানুদাসের দিকে। তার বউ ঘী দিয়ে ভাত খায়। তার বউ মানে চন্দনা। রুপার মতো শরীর যার। হাসলে মনে হতো দানা দানা মুক্তো ঝরে পড়ছে। এই অবিনাশ ছয় বছর আগে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে কাতর হয়ে বহুবার বলে ছিলো, চন্দনা, দে না তোর শরীরটা..। চন্দনা এখন কানুদাসের স্ত্রী। কানুদাসের গোপন চেলাই মদের ব্যবসা। ফেনসিডিল হিরোইনও সাপ্লাই দেয়। সে চায়ের দোকান দিয়ে বসে আছে। লোকজন তার দোকানে খাটি দুধের চা খায়। অবিনাশও। মাঝেমাঝে কানুদাসের উপর কঠিন রাগ হয়। ঈর্ষা হয়। এই শালা তার বউয়ের গল্প শোনায় ক্যান? মালাই দুধের গরম চা হাতে দেয়ার সময় মুচকি হেসে চন্দনার কথা বলে ক্যান? তার ক্রোধ হয়। ভেতরের ব্যাথা দগদগ করে ওঠে। গরম চায়ের কাপে ঠোঁট চেপে ভাবতে থাকে। সে যে দুধের চা খায় সেই দুধের ঘী খাচ্ছে চন্দনা। কী তাজ্জব! চুলার উপর ক্রমাগত ঘন হয়ে আসা দুধের দিকে চেয়ে ভাবে অবিনাশ। গরম দুধ জলের ফোয়ারার মতো আকাশের দিকে উঠতে গিয়ে নেমে আসে নিচে। টগবগিয়ে ফুটতে থাকে। এত পাশে স্বর জমে। সেই স্বরের ঘী চন্দনার সামনে যাবে। চন্দনা খুব বেশি দুরে নেই। বিয়ে হয়ে গেলও কত কাছাকাছি দুজন। শুধু দেখা হয় না। আগের মতো কাছে আসে না। হাসে না। কথা বলতে বলতে পাখির মতো পালায় না। বাতাসে গন্ধ ছড়ায় না। অবিনাশও চন্দনার কাছে কাছে কাতর হয়ে বলতে পারছে না, চন্দনা, দে না তোর দেহখান। একবার..
ঘরে ফিরে অবিনাশ মহুয়াকে মিথ্যা বলে। নিজেকে আড়াল করে রাখে। মহুয়ার সাথে খিস্তি করে। মহুয়াও ছেড়ে দেয় না। ঝাঝালো গলায় জবাব দেয়। রাত হয়। মহুয়া ঘুমাতে যায়। অবিনাশও। কোনো কোনো দিন স্নান করা হয় না। শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ে ঘুমাতে যায়। অনেকটা চন্দনার উপর রাগ করে। এই শরীর গন্ধ থাক। এই শরীল গন্ধ-ই থাক…।
নেশার ঘোরে চন্দনার মুখ ভেসে আসে মহুয়ার মুখের আদলে। মহুয়াকে ঝাপটে ধরে। ফের ছেড়ে দেয়। নেশার ঘোরে ভেসে আসে চোখের উপর কানুদাসের দুধের পাতিল। দুধ টগবগিয়ে ফুটছে। স্বর পরছে। ঘন হচ্ছে। ঘী হচ্ছে। সেই ঘী যাচ্ছে চন্দনার খাবার হয়ে। দুধ উঠে আসছে চা হয়ে তার সামনে। একই পাতিলের দুধ। তার মতো অনেকেই এই দুধ খাচ্ছে। অবিনাশ ভাবে, অনেকেই কি তবে চন্দনাকে তার মতোই ভাগ করে নিচ্ছে। কিংবা চন্দনা নিজেকে এভাবে ওভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে অনেকের ভেতর। অথচ এই চন্দনার জন্যই সে আজ এতো নোংরা। স্নান করে না। দুপুর হলে বাড়িতে খেতে আসে না। সারাদিন মদ খেয়ে পরে থাকে হাসপিতালের হিম ঘরের পাশের বারান্দায়। কুকুর বেড়ালের মতো। ডোমের শরীর কেউ শুখতে আসে না। দেখা হলেও কেউ হাত বাড়িয়ে করমর্দন করতে আসে না। নাক সিঁটকে সরে দাঁড়ায়। জেলা অফিসে বেতন তুলতে গিয়ে দেখেছে ভদ্র মানুষেরা কেমন দুর দুর করে তাড়ায়। ভয়ও পায়। আতংকিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। মানুষের লাশ আহরহ কাঁটছে যে তাকে জড়িয়ে ধরার মতো কেউ কি আছে? নেই। কেউ নেই।
যদিও দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। মানুষের জাত পাতের শ্রেণী বেষম্যের দেয়াল গুড়িয়ে দিচ্ছে আধুনিক সভ্যতার এই সব মানুষ। তারপরও ডোম যারা তারা এখনো সেই প্রাচীন কালের নিকৃষ্ট শ্রেণীর অবস্থায় রয়ে গেছে। তাদের বেতন হয় না। তাদের নিয়োগের বিধান নেই। তাদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে কারোর মাথা ব্যাথা নেই। স্বাস্থ্য কর্মীরা এ পলি¬তে যেতে ঘৃণা করে। মন্দির মসজিদেও এরা নিঃসঙ্কোচে ঢুকতে ভয় পায়। অনেকেই ভাবে এই শালারা মানুষের লাশ জিম্মি করে টাকা আদায় করে, এই শালারা লাশ জিম্মির টাকায় মদ খেয়ে মাতাল হযে পরে থাকে। এরা মানুষ না। অথচ তারা জানে না, ঐ সব মানুষের অপমৃত্যু হলে ডোমের হাতে পরতে হয়। ডোম তাদের দেহ খুব যত্ন করে কাটে। অঙ্গ প্রতঙ্গ গুলো সাবধানে ফরমালিনের বোয়ামে রাখে। সেলাই করে। অথচ এসব জিবিত মানুষের কাছে ডোম খুব অপ্রয়োজনীয় কেউ। ঘৃন্নীত।
একটি সন্ধ্যায় মর্গে চন্দনার রুপোর মতো শরীরটা উঠে এলো। পাকা মশৃন পাটাতনের পরে নিথর দেহ চন্দনার। অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিলো চন্দনার। কিভাবে ঘটনাটা ঘটল তা জানা যায় নি। অবিনাশ জানতে পারেনি। ভোরে বাড়ি থেকে আসার সময় কানুদাসের চায়ের দোকান বন্ধ দেখেছিলো অবিনাশ। ও সময় পেটে দুই আসল মাল না ফেলতে পারলে সারাদিন কাজ কর্মে মন বসে না। শরীর টন টন করে। সকালে পেটে মাল পরে নি। হিম ঘরে রাখা বোতলগুলো শূণ্য। মালের যোগার হচ্ছে না। এ রকম দিন খুব কম এসেছে তার জীবনে। মাল ছাড়া বাঁচা যায়? দেশি বিদেশি এক বোতল যোগাড় করতেই হবে। লোক লাগিয়েছিল। পাওয়া যাচ্ছিল না। শরীরের টনটন ভাবটা সারাদিন ছিলো। বিকালের দিকে এক বেওয়ারিশ লাশ কাটতে হয়েছে। যে লাশের বকশিশ মেলেনি। মনটা বেশ খারাপ। বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে ঝামেলায় পরতে হয়েছিলো। লাশ’টির খোঁজ খরব নেয়ার কেউ ছিলো না। সন্ধ্যায় মদের যোগার হয়। পুরো এক বোতলই পেটের ভেতর ঢেলে দিয়েছিলো অবিনাশ। সারাদিন পর তার মনটা শান্ত হয়। ঝিম ধরে বসে থাকে মেঝের পরে। আর তখনই খবর আসে, একটা লাশ এসেছে। নেশায় ভেঙে পরা শরীরটাকে টেনে নিয়ে মর্গে ঢুকে খানিক চুপসে যায় সে। একি দেখছে! চন্দনা!
চন্দনার শরীর পরে আছে। ছাঁদ থেকে নেমে আসা বিদ্যুৎ তারের ঝুলন্ত ভারি বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় চাদের মতো চকচক করছে শরীরটা। চন্দনার শরীরের সেই গন্ধটা নেই। লাশ কাঁটা ঘরের চিরচেনা সেই ফরমালিনের গন্ধ। চন্দনার শরীর এখন বেওয়ারিশ লাশ! পুলিশ ফেলে রেখে গেছে। ওর জন্য কেউ আসেনি! কেন আসেনি? চন্দনার জন্য কেউ কাঁদছে না। একজন ডাক্তার শুকনো মুখে বলছেন, কী দেখছে অবিনাশ? হুশ ফেরে অবিনাশের। কাঁটো, এই যে এইখানটায়। চন্দনার শরীর থেকে মশৃণ শাদা কাপড় সরিয়ে নেয়া হয়। অবিনাশ ছুরি চালায়। আজ তার দেহের ভেতর দারুণ নেশা। অন্যরকম নেশা। পুরো শরীর কাঁপছে। পৃথিবী কাঁপছে। হাজার রকমের রং অদ্ভুত ভাবে ফুটে উঠছে। এরকম নেশা তার কোনোদিনও হয়নি। এমন নেশা কেন হচ্ছে বুঝতে পারে না। চন্দনার দেহ খানা জলের পরে শাদা শাপলার মতো পুটে উঠছে যেন ধীরে ধীরে। অবিনাশ অবাক তাকিয়ে থাকে। এটা সেই দেহ যার জন্য ছয় বছর আগে থেকে আজ অবধি নিজের শরীর পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। এই সেই চন্দনা! এই সেই ঠোঁট, রং লাগানো। শরীরে অবশ্য সুগন্ধি নেই। অন্য এক গন্ধ! ঠোঁটে হাসি নেই, অন্য এক শব্দ! যেন চন্দনা যেকথা কোনো দিন বলেনি আজ তাই বলতে এসেছে। শান বাঁধা পাটাতনের উপর রাখা চন্দনার শরীর টাকে কাঁটছে অবিনাশ। বুকের উপর লম্বালম্বি ছুরি চালাচ্ছে। কলিজা বের করে নিচ্ছে। ধকধক করছে হৃদয়পিণ্ড তার। কাঁচের বয়ামে তুলে রাখছে। সাবধানে। অবিনাশের মনে হয় তার বাপজানের কথা। সাবধানে রাখ বাপজান। লাশের চোখ আছে, সেই চোখে দ্যাখে, কথা শোনে, সাবধান! অবিনাশ চন্দনার নিথর মুখটার দিকে চেয়ে প্রায় অষ্পষ্ট গলায় বলে উঠে, চন্দনা, ঠিক তো আইলে ডোমের কাছে। আইলিই তো শেষ পর্যন্ত! দ্যাখ-এই চন্দনা..।
ছয় বছর আগের এই চন্দনার জন্য তার ঘুম হতো না। সারাদিন মাতাল হয়ে পরে থাকতো। সুশীল দাস মাতাল ছেলেকে লাশ কাঁটা কাজে নামায়। লাশ কাঁটার সময় সুশীল বলত, বাপরে, লাশ কাঁটার মধ্যে কিন্তুক নেশা আছে। নেশা না অইলে এ কাজ করন যায় না।
ছয় বছর আগে যে চন্দনার জন্য তার দারুণ কষ্ট হতো এখন কি তা হয় না? খুব হয়। হয় বলেই সে লাশ কাঁটার নেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে।শরীরটাকে দুর্গন্ধ আর মদের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। শরীরের যত্ন নেই। মহুয়ার দিকে নজর নেই। তিন কন্যার দিকে নজর নেই। ঘরে ফেরে গভীর রাতে। আবার ভোর না হতেই বেরিয়ে পরে। বসে থাকে হাসপিতালে লাশের আশায়।
