কবির ভেতরে সুপ্ত থাকে বিচিত্র বোধের উন্মেষ ঘটানোর অভীপ্সা। আমরা যখন বলি, ‘হও’… এই ‘হও’ কোনো একার্থবাচক নয়। কেননা বলবার সময়—ই তাকে বহু—অর্থক করার সক্রিয় সদিচ্ছা ছিলো। মানুষকে ধ্যানী না করতে পারলে বিশ্ববীক্ষা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। সন্ন্যাস—গুরু কিংবা সুফি—গুরু যে প্রক্রিয়ায় এই ধ্যানমার্গে উপনীত করেন তাঁর শিষ্যকে, একজন কবি তেমন কাউকে শিষ্য করেন না কিন্তু তাঁরও ভেতরে থাকে গুরু—শিষ্য আচার এবং যেহেতু তাঁর প্রক্রিয়াটি ভিন্নÑ মানে শব্দ দিয়েই চেতনার প্রক্ষেপণ ঘটাতে হয় এবং বিক্ষেপণ কর্মটি করতে হয়, তাই সে তাঁরই মতো— তাঁরই বোধের বিচিত্র ভ্রমণের মতো করে শব্দ—মাল্য গেঁথে চলেন; যেন পাঠক সেই পথ ধরে চলতে চলতে বিশ্ব চরাচরের আলো—অন্ধকার—এর বর্ণালী শোভা উপভোগ করেন।
আমরা কবি ওমর আলী’র পথ ধরে হাঁটবো। কবি ওমর আলী’র বিশ্বকে আমাদের জানা বিশ্বের ভেতর নিয়ে নান্দনিক উপায়ে ভেঙে দেখবো এখানে আলো আর অন্ধকারের বিচিত্র বর্ণ জ্বলে ওঠে কি না! কিন্তু আমাদের জ্ঞাত জগত কি কবির হৃদয়—বিশ্বের সমগ্র ছবিকে ধারণ করতে পারে?Ñ পারবে? আমাদের ভুল প্রেমÑ ভুল ভালোবাসাÑ ভুল রাজনীতিÑ ভুল সমাজ—জীবন কবির হৃদয়—আয়নায় ক্রমাগত উলঙ্গ হবে? নাকি এক বৃষ্টিস্নাত গ্রামের মেঠোপথ ধরে ঘুরতে ঘুরতে আমরাও হারিয়ে যাবো কবির অচীন দেশে! আমরা হাঁটবো কিন্তু কবি কোন পথ ধরে হাঁটেন? কোন কোন পথের বাঁকে তাঁর বিশ্রামের শ্বাস থাকে? কোন পথের ধূলোয় লেগে থাকে তাঁর শরীরের ঘ্রাণ? এর জন্য কি আমরা বুলবুল কলেজ এর সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে ধীরে ধীরে শরীর দুলিয়েÑ মাটির দিকে খুব ঝঁুকে হেঁটে হেঁটে কোমরপুর চলে যাবোÑ যেখানে কবির ছিন্নবস্ত্র, লেখার খাতা, লেখার কলম, কবির গ্রাম্য বউ পড়ে থাকে। ওখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চেয়ারম্যানের মোড় পার হয়ে চলে যাবো প্রমত্তা পদ্মার কাছে। যে পদ্মায় ভেসে ভেসে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— যে পদ্মার ওপারেই ছিলেন রবীন্দ্রনাথÑ সেই পদ্মার পারে গিয়ে কি দেখবোÑ ওইÑ ওই তো ওমর আলী হেঁটে যাচ্ছেন… ওই তো ওমর আলী আকাশ দেখছেন, পাখি দেখছেন?
কবি ওমর আলী বুলবুল কলেজের সামনে একটি জীর্ণ কক্ষে কয়েকজন ছাত্র পড়াতেন। পড়ানোর চাইতে তিনি বেশিক্ষণ ধরে কবিতায় লীন হয়ে থাকতেন। আমরা কি ওই কক্ষ ভেঙে ভেঙে দেখবো কবির পায়ে মাখা ধূলো আজ কোথায় গেলো? কোথায় কবির হাত দুটিকে প্রশ্রয় দেওয়া কবিতা লেখা সেই দশটি আঙুলের স্পর্শ পাওয়া টেবিলÑ কোথায় চেয়ার?
এই ইট—কাঁঠ, এই ধূলো—বালি, এই মেঠো পথÑ পিচ ঢালা সড়কের কোথায় কবি? কোথায় কবির ছায়া ও ঘ্রাণÑ এই আকাশ ও মাটি কি উত্তর দেবে আমাদের? কবি পাখি দেখতেনÑ পাখির চোখে চোখ রেখে বলতেন, ক্যামেরা থাকলে আমার চোখ পাখি দেখতো নাÑ তাই ক্যামেরা না থাকাটাই ভালো।
একদিন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। শহরের প্রায়ান্ধকার গলি দিয়ে হাঁটছিÑ কবি আখতার জামান ও কবি সমীর আহমেদ এর সঙ্গে। দুই বৃক্ষপ্রেমি বৃক্ষ—কবি হাঁটছেন বোধের এক অলৌকিক আলোক—রশ্মির পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে যখন আমরা বোধের বর্ণিল নদীর তীরে তখন, কবি আখতার জামান বলে উঠলেন— ওমর আলী একুশে পদক পাবেন, আজ হোক আর কাল! কবি সমীর আহমেদ বলে উঠলেন, আর বলো না, এরা কি যে করে! সব শুধু ধানাইপানাই! আলোচনায় আমি অর্বাচীন শ্রোতা। দুজনই আমার শিক্ষক। পথ চলতে চলতে দুয়েকটা উদ্ভট প্রশ্ন করি তাঁদের। তাঁরা তখন সে প্রশ্নের উত্তর দিতে আলোচনা করেন। এদিন আমার প্রশ্ন হলোÑ ওমর আলী কে? বড় বিচিত্র সে কণ্ঠ আমার। কবি আখতার জামান বিস্মিত হলেন। বললেন, তুমি কবি ওমর আলীকে চেনো না? আস্তে আস্তে মাথা নাড়ালাম। অতঃপর কবির পরিচয় পেলামÑ এক ধূলোমাখা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষের আয়ুআলো নিয়ে আমাদের ভূÑখণ্ডের বায়ু—জলে ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে গ্রামীণ বৌয়ের সৌন্দর্যে্য বিভোর মানুষ। জগতের আর সব লেনদেন ছাপিয়ে যিনি কবিতার ভূমিপুত্রÑ যিনি রক্তেরÑ মাংশের মানুষ হয়েও অদ্ভুত আলোকপ্রাপ্ত। তারপর দেখা গেল কবি জানাচ্ছেন :
কবিতা ঝর ঝর করে ঝরে, সাদা নুড়ির মতো ঝর্ণা
টিএস এলিয়ট, মালার্মে, রবীন্দ্রনাথ, ওমর আলীর হাতের ওপরে কবিতা ঝরে বৃষ্টি ঝরে
আমাদের চিত্তে দোলা লাগে, ঝর ঝর করে ঝরে পড়া কবিতা হয়ে ওঠে রাতভর শিশিরে সিক্ত হওয়া ভোরের শিউলির মতো। ভেজা শেফালির মতো ঝরতে ঝরতে কবিতা নেমে আসে আমাদের শিল্পিত মনশ্চক্ষে। চোখ বন্ধ করে ভেজা শেফালি ও ঝরতে থাকা শিউলির ভেতর দিয়ে আমরা কবিতায় প্রবেশ করি :
কবিতা মনের মধ্যে এক খণ্ড সীমানা চৌহদ্দির জমির ওপরে
ঝরে যায় বহুক্ষণ ঝরে যায় বৃষ্টি
ওপরে মেঘ বিজলির চমক বজ্রপাত হতে থাকে
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ পেরিয়ে বজ্রের চমকিত আলোক বিভায় আমরা আলোকিত ও পুলকিত হই ফের। ফের দেখি কবি গাচ্ছেন বিচ্ছেদের আগুনে পোড়া বিরহী যক্ষের বেদনার গান :
বিরহী যক্ষ কৈলাসগিরি থেকে মেঘদূত প্রেরণ করেন প্রিয়ার উদ্দেশে
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
আমরা এগোতে থাকি কবির দিকে… কবির পথে… কবির দেখাÑজানা বেদনাবিশ্বে আমাদের অনুপ্রবেশ ঘটে; কবি কি বিরহী যক্ষ… তাঁর বেদনার গান কবিতা হয়ে যক্ষের মেঘের মতো ভেসে আসছে আমাদের কাছে? আমরা উল্লসিত হই, উৎফুল্ল হই। আরো এগিয়ে যাই, দেখিÑ কবি গাইছেন :
কবিতা ঝর ঝর করে ঝরে শিশির মুক্তা হোমারের মনের ওপর
অন্ধ হোমার গেয়ে যান ইলিয়াড ও ওডিসি
সুন্দরী হেলেনকে নিয়ে যান প্যারিসÑ প্রিয়ামের পুত্র
ট্রয়ের যুদ্ধ হয় কাঠের ঘোড়া তৈরী হয় হেক্টর মারা যান
অ্যাকিলিস মারা যান
কবি হাঁটছেন সহ¯্র বছরের প্রাচীন পথ ধরে প্রাচ্যের বেতসা ছাড়িয়ে প্রতীচ্যের টয়ে। চোখের পর্দা নামিয়ে শ্যামল রঙের রমনীকে পাশে রেখে সুন্দরী হেলেনের কাছে। পরিণতিতে সভ্যতার কাঠকে ডিঙিয়ে মারা যান বীর হেক্টর—অ্যাকিলিস।
বিচলিত হয় আমাদের হৃদয়Ñ মৃত্যু মানে বিচ্ছিন্নতার আশংকায় বিহ্বল হই। অতঃপর দেখি কবি আমাদের জানাচ্ছেন, মৃত্যু এক অমোঘ নিয়ম। কে না মারা যায়! কে না নিঃশেষিত হয়! পৃথিবীর আয়ুর সমান এই চলে যাওয়া :
পৃথিবী কোটি কোটি বছর ঘুরতে থাকে নিয়ম মতো
এক মুহূর্তের জন্যও থামে না।
এবং দেখিÑ মানুষের মতোই কবি স্যাফো, খলিল জিবরান জন্ম নিচ্ছেন ও মারা যাচ্ছেন। বুঝি কবিও যাবেনÑ কবিরাও যাবেন। আমরা এই জন্ম ও মৃত্যুর খেলার মাঠে খেলতে থাকি এবং খেলতে থাকে মানুষ, খেলতে থাকবে মানুষ।
কবি তাঁর সময়ের অনুবাদকÑ সময়ের নিবিড়তম ইতিহাসকার। সময়ের ভেতর দিয়ে কবি জেগে ওঠেন আপন সত্তায়Ñ আপন মহিমায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে। আর কবিতার ভেতর দিয়েই বুনে বুনে যান সময়ের ঘটনাপুঞ্জÑকবিতা হয়ে ওঠে সময়ের শাশ্বত লিপি। এই সময় আসলে কি? সময়ের শুরু ও পরিণতি কেমনতর ধারণা? সময়ই কি শেষ হয় নাকি অস্তিত্বের বিনাশ হয়? আমরা যখন এইসব প্রশ্নের অবতারণা করছি ঠিক তখনই সে সব প্রশ্নকে অতীতে প্রেরণ করছি এবং আমাদের সেই সময়ের অস্তিত্বকে অতীতে রেখে দিচ্ছি। আমাদের জ্ঞাত জ্ঞান—জগতের শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ—প্রাণ কবি নিরন্তর জিজ্ঞাসার সেই সময়কে দেখছেন :
সময় তো চলে যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন
শেষ হয় তীরে গিয়ে, জীবন ফুরিয়ে যায় ঠিক
এখনি যখন প্রতি মুহূর্তের অতীতে গমন;
আমাদের ‘এই আছি’ ধারণাকে প্রতিনিয়ত পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকা ধারণা নতুন নতুন স্মৃতি সৃষ্টিতে মেতে রয়। কবির গীত ‘নতুন মুহূর্ত ফের জন্ম নেয়, সুখের দিকে/ যায় যেন মরণের দিকে কোনো নতুন অতীতে’ সময়ের উত্তাল পথে। আমাদের চেতন নির্মাণ—বিনির্মাণের পরিক্রমায় এগোয় ‘যেমন একটি ফের সূর্যোদয় থেকে ক্রমাগত/ সন্ধ্যার চরম কোণে যেতে থাকে মৃত্যু ছুঁয়ে নিতে’।
এই জন্ম—মৃত্যু, অগ্র—পশ্চাৎ গমন কলায় দেখি আমাদের বর্তমানকে ছেড়ে আসা অতীতবেলা ভূত—ভবিষ্যৎকে ভেঙে ফেলছে এবং মর্মরিত পাতার মতোÑ ফেনিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মথিত হতে থাকা হৃদকমল চিন্তার অযুত রশ্মি বিছিয়ে দিচ্ছে ফুরিয়ে যাওয়ার আশংকায়। এই আহত বর্ণিল শোভাযাত্রায় কবি বিস্ময়াবিভূত কিংবা দ্বিরুক্ত প্রশ্নের আভায় মোমের প্রদীপ জ্বেলে জানাচ্ছেন :
আমারও প্রাণের আয়ু শেষ হয়ে যেতেছে তাহলে,
একটি নিশ্বাস থেকে মনে হয় আরেক নিশ্বাসে
আমিও যেতেছি কমে, যে রকম ধীরে ধীরে গলে
মোমের প্রদীপ জ্বলে আগুনের উত্তাপে, বাতাসে।
কবি কি সংশয়দীর্ণ নাকি সংশয় উত্তীর্ণ? নাকি সংশয়—নিঃসংশয়ের মাঝামাঝি দুলতে দুলতেÑ দুলতে দুলতে আমাদেরকে বেঘোরে চূর্ণ করেন ভেতরে—বাইরে? কবির কর্ম কি তাই? এই কর্মের ফলেই কি মানব—বোধের যাত্রা পরিপূর্ণ—পরিপুষ্ট হয়? আমাদের এই আকাক্সিক্ষত প্রশ্নের সমান্তরাল কি কবির বাক্য ‘ তাহলে, কী হবে, যদি আমারও সময় শেষ হয়/ কী হবে, হে প্রভু, পাব সে মুহূর্তে তোমার আশ্রয়?’
উৎস হতে বিচ্ছুরিত হয়ে উদ্দিষ্ট কর্মে নিয়োজিত থেকে আমাদের প্রত্যাগমন প্রত্যাশার অমিমাংশিত আলোচনায় কবির বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। সেই সব জানা—অজানা পথ—পরিক্রমায় সময়—স্বপ্ন—কল্পনার মুখোমুখি থেকে আনন্দ—উল্লাস—আতংক—সংশয় নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে দুঃস্বপ্নের গানও কবি গানÑ
এখন ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে কথা বের হয় না
ভয়ে গোঙাতে থাকি আঁ আঁ করে;
মনে হয়, ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছি
আমাকে ধরতে আসছে বন্দুকধারীরা,
চিৎকার করতে যাই অ্যাপাচি অ্যাপাচি
কিন্তু কথা বের হয় না মুখ দিয়ে
শুধু গোঙাতে থাকি আঁ আঁ করে
এই গোঙানি কার? কবির একার? নাকি একটি দেশেরÑ নিপীড়িত মানবেরÑ নিঃপেষিত নাগরিকেরÑ যুদ্ধ বিরোধী কবির? আমাদের ভাববার অবকাশে কবি জানান, তিনি স্থানোত্তীর্ণ হলেও তাঁর স্থানের মানুষ। তিনি বাংলা ঘুরে বাংলার পাবনাতে ফিরে আসেন, আমাদের খেঁাজার কাজে নিযুক্ত করেন, কোথায় ভেড়ামারা কলেজ, কোথায় কলেজের উত্তর দিকের প্র¯্রাবখানা, কোথায় লেগে আছে গুলির দাগ? আর কোথায় জনতা ব্যাংকÑ তার সামনে ছড়ানো ছিটানো লাশÑ যেসব কুকুরের খাদ্য ছিলো তখন? কবির ভাষায় :
হঠাৎ দেখি বিশাল শরীরের দুটো লাশ কুকুরে খাচ্ছে
মনে হলো, বিদেশী সৈন্য
তাদের হাড় মড় মড় করে চিবোচ্ছে কুকুর
ভেড়ামারা কলেজের উত্তর দিকে প্র¯্রাবখানার দেয়াল
রাইফেলের গুলিতে ছিদ্র হয়ে আছে
যেমন দেখেছিলাম পাবনা জনতা ব্যাংকের…
নারকীয় পাবনা শহর… লাশ আর ছড়ানো ছিটানো
ট্রেসার লাইটে
তারপরেও দুঃস্বপ্নকে অতিক্রম করে কবি আছেন প্রেমেÑ ভালোবাসায়। শিশির সিক্ত ভোরের মোহ নিয়ে কবি বৈশাখে উঠে আসেন প্রেমের আরতি নিয়ে। কবি বলেন, ‘বৈশাখে আবার আমি তোমাকে ভালোবাসি/ স্বপ্নে চলে যাই আমার সুদূর ভেনিসে’। ভাসতে ভাসতে গণ্ডোলায় বসে কবি দেখেন জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, কবি আর তাঁর প্রেয়সী। প্রেমের সাম্পানে কবি ভাসতে ভাসতে ফিরে আসেন চট্টগ্রামেÑ কর্ণফুলীতেÑ ভালোবাসার বৈঠা হাতে। নিরূপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর প্রেমের কবি বৈশাখের চাঁদে মাতোয়ারা হয়ে গাইতে থাকেনÑ
বৈশাখের চাঁদ মুখ টিপে হাসে আমাদের
দুজনের মাথার উপরে।
তুমি আমার গান, তুমি আমার সুমধুর সুর,
একবার গণ্ডোলায় একবার সাম্পানের পাটাতনে,
পানির সিম্ফনিতে কী যে মিষ্টি বেজে ওঠে,
জার্মানির বেটোেফেন এই সুর সৃষ্টি করেছেন।
চাকমা ইটালিয় যুবতীর খিলখিল হাসি।
কবি জানেন ভালোবাসা মূলত নবায়নযোগ্য এবং একে হালনাগাদ করতে হয়। কবি তাই প্রতি বৈশাখে বাংলার ঐতিহ্যে আমোদিত ও প্রাণিত হয়ে তাঁর ভালোবাসাও নবায়ন করেন অতীতের ব্যর্থতা—বেদনার ধুলো ধুয়ে মুছে। নিবেদিত প্রেমকে নতুন করে সাজিয়ে নেন যাতে আগামির ঝরে ভেঙে না যায়। যদিও কবি জানেন, ‘ শেষ পর্যন্ত চাঁদ ডুবে যাবে, নক্ষত্র ডুববে আকাশে/ ভালোবাসার সাম্পান গণ্ডোলা ডুববে না’।
আমরা আমাদের প্রস্তাবনায় ফিরে যাই। কবির পাঠ—শিষ্য কিংবা পাঠোত্তীর্ণ ধ্যান—শিষ্য এবং এরপর ধ্যানান্তিক কর্মনিষ্ঠ উজ্জ্বল চৈতন্যের সন্তান মানব ইতিহাসের আকীর্ণ পথে কবির পথ রচনা অব্যাহত রাখেন। অর্থ্যাৎ কবির শিষ্য হয় স্থান—কাল অতিক্রম করে স্থানোত্তীর্ণÑকালোত্তীর্ণ। আমাদের কবি ওমর আলীর সেই পরম্পরা কেমনতর তার রেখাদৃশ্য আমরা হয়তো দেখার কসরত করবো। ইতোপূর্বোক্ত বাসনা সত্ত্বেও শেষ করবো কবির স্পর্শ পাওয়া, তাঁরই ছাত্র আরেক বরেণ্য কবি মজিদ মাহমুদকে উদ্ধৃত করে, ‘আমাদের কবিতার ইতিহাসও যে রাজনীতি ও রাজধানীÑ কেন্দ্রিক, ওমর আলী তার যথার্থ শিকার। নানা রাজনৈতিক প্রয়োজনে, রাজা পরিবর্তনে তারও যেমন প্রয়োজন ছিল না; তাকেও তেমন প্রয়োজন ছিলো না; তাই প্রচারের পাদপ্রদীপের বাইরেই থেকে গেছেন তিনি চিরকাল’।
